
“প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি ঘটনাস্থলে ধর্ষণ চেষ্টার মত কিছুই ঘটেনি, পুলিশের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই মামলা রেকডের অভিযোগ!”
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহ আলম খলিফার বিরুদ্ধে এক অবসরপ্রাপ্ত নারী সেনাসদস্যকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে জয়দেবপুর থানায় মামলা হয়েছে। তবে অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সার্ভেয়ার আবুল হোসেন গেদু মিয়া। তার দাবি, ৩১ জুলাই জমি মাপাকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য ও ওই নারীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটলেও ধর্ষণচেষ্টার মতো কোনো ঘটনা তার সামনে ঘটেনি।
অভিযোগকারী নারীর স্বামী নজরুল ইসলাম জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে শাহ আলম খলিফা পৈতৃক সূত্রে পাওয়া একটি জমি তার কাছে ও তার স্ত্রীর কাছে বিক্রি করেন। পরবর্তী সময়ে তারা জমিটি বিক্রি করতে চাইলে শাহ আলম খলিফা সেটি পুনরায় কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। জমিটির মূল্য ১৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করে ১১ লাখ টাকা পরিশোধ এবং বাকি টাকা দিয়ে তিন মাসের মধ্যে সাব-কবলা দলিল করার শর্তে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি বায়নাপত্র করা হয় বলে তিনি জানান।
নজরুল ইসলামের দাবি, বায়নাপত্রে ১১ লাখ টাকা নগদ দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও তাকে প্রথমে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয় এবং বাকি এক লাখ টাকা পরে দেওয়ার কথা বলা হলেও তা আর পরিশোধ করা হয়নি। জরুরি প্রয়োজনে জমিটি বিক্রি করলেও পরবর্তী সময়ে বাকি টাকা ও দলিল সম্পাদন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়।
তবে নজরুল ইসলামের অভিযোগ, জমি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি শাহ আলম খলিফা গত এক থেকে দেড় বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে তার স্ত্রীকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। ৩১ জুলাই জমি মাপার সময়ও তিনি তার স্ত্রীকে কুপ্রস্তাব দেন এবং একপর্যায়ে তার ওপর আক্রমণের চেষ্টা করেন। ওই নারী দাবি করেন তাকে গত ২ বছর যাবত বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনে কু-প্রস্তাব দিয়ে আসতেন অভিযুক্ত ব্যক্তি কিন্তু তিনি এর পক্ষে কোন কল রেকড অথবা অন্য কোন প্রমান দেখাতে পারেননি। এ ঘটনায় তারা থানায় মামলা করেন বলে জানান নজরুল ইসলাম।
অভিযুক্ত ইউপি সদস্য শাহ আলম খলিফা ধর্ষন চেষ্টার অভিযোগ অস্বিকার করে বলেন, আমি উক্ত জমি বায়না করে ভোগ দখল করে আসছি , তারা জমি রেজিস্ট্রি করেও দেয় না বায়না করা টাকা ও ফেরত না দিয়ে ঘটনার দিন উক্ত জমি দখলে গেলে আমার সাথে বাগবিতন্ডা হয়। পরে ঐদিন বিকেলেই আমার বাসায় বসে উক্ত নারী ও তার স্বামী সহ বসে একটা ফয়সালা হয়। এর পর শুনতে পাই আমার বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার মামলা দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত:
স্থানীয় সার্ভেয়ার গেদু মিয়া বলেন, নজরুল ইসলামের স্ত্রী ফোন করে তাকে জমি মাপার জন্য ঘটনাস্থলে নিয়ে যান। তিনি জমির মাপজোক শুরু করার একপর্যায়ে ইউপি সদস্য শাহ আলম খলিফা সেখানে এসে জমি মাপতে নিষেধ করেন। এ সময় দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়।
গেদু মিয়ার ভাষ্য, ওই নারী মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে ইউপি সদস্যেকে উদ্যেশ্য করে তাকে কুপ্রস্তাব দেয়া সহ নানা অভিযোগ করে কথা বলছিলেন বিপরিতে ওই ইউপি সদস্য ও তাকে গাল মন্দ করছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শাহ আলমের সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। পরে ওই নারী সহ তার সাথে থাকা অন্যরা ফোনটি উদ্ধারের জন্য ওই ব্যক্তির পিছু নিয়ে শাহ আলমের বসতবাড়ির কাছে গেলে সেখানে শাহ আলম মেম্বারের লোকজন তাদের ঘিরে ফেলেন। পরে গেদু মিয়া, ও ওই নারীর স্বামী নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে উভয় পক্ষের কথা শুনে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং এই সিদ্ধান্ত হয় যে হয় তারা বায়নার টাকা ফেরত দেবে নয়তো জমি রেজিষ্ট্রি করে দেবেন। পরে ওই নারীর মোবাইল ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়। ঘটনার পরপরই ৩১ জুলাই বিকেলে ওই নারীর স্বামী সহ অভিযুক্ত ইউপি সদস্যের বাড়িতে বসে মিমাংসার সময় ধারণ করা ১৬ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতেও তা পরিস্কার দেখা যায়।
গেদু মিয়া দাবি করেন, তিনি ঘটনাস্থলে থাকা অবস্থায় ওই নারীকে শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণচেষ্টার কোনো ঘটনা দেখেননি। এমনকি ওই সময় ওই নারী বা তার স্বামীও এ ধরনের কোনো অভিযোগ করেননি। তার দাবি, ঘটনাটি জমি মাপাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এলাকাবাসীর বক্তব্য:
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা শাহ আলম খলিফাকে দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধি ও এলাকায় জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, এর আগে তার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ তারা শোনেননি। একই সঙ্গে অভিযোগকারী নারী ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার এবং স্থানীয়দের হয়রানি করতে অতিতে অনেকের নামে মামলা করার অভিযোগও করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘটনার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই জয়দেবপুর থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। তাদের দাবি, মামলার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ, ভিডিও ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের তথ্য যাচাইসহ নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করে প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা:
একদিকে জমির বায়নাপত্র, টাকা লেনদেন ও দলিল সম্পাদনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা স্বীকার করা হচ্ছে; অন্যদিকে ওই বিরোধের মধ্যেই নারীকে ধর্ষণচেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
এদিকে ঘটনার দুইদিন পর ২ আগস্ট কোন প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই সিআরপিসির ১৫৪ ধারায় ওসির ক্ষমতাবলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯(৪) , ১৪৩,৪৪৭,৩২৩,৩০৭,৩৭৯,৫০৬, ও পেনাল কোড ১৮৬০ ধারায় মামলা নং ৬ রেকড করেন জয়দেবপুর থানা পুলিশ। এই বিষয়ে জয়দেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আল মামুন বলেন, অভিযোগ পেয়েছি মামলা রেকড করেছি , তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। তিনি আরো বলেন এই বিষয়ে পুলিশের পদক্ষেপে কোন ঘাটতি নেই।
সম্পাদক : মোঃ আব্দুল আজিজ
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : হাউজ নং - ৬, রোড নং - ১০, সেক্টর - ১০, উত্তরা ঢাকা।
Copyright © www.nch52.com all rights reserved.- 2024