ঢাকার পুণ্যভূমিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের আগমন ধ্বনিত হয়। শরতের কাশফুলের মায়াবী সৌরভ, শিউলির গন্ধ আর সকালের নবীন সিঁদুরে আবরিত বাংলার এই শরতের সব রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ উজাড় করে অপেক্ষা করে দেবী দুর্গার আবাহনের। অষ্টমীর অঞ্জলি, আরতির নাচ, বোধন থেকে বিসর্জন একেবারে অসামান্য এক সামাজিক বন্ধন তৈরি করে।
একসময় পারিবারিক পর্যায়েই প্রধানত দুর্গাপূজা আয়োজিত হতো। ধনাঢ্য পরিবারগুলো ছিল উদ্যোক্তা এবং আয়োজিত দুর্গাপূজা 'বনেদি বাড়ির পূজা' নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে একেকটি এলাকার বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু করেন, তা 'বারুয়ারী পূজা' বা 'সর্বজনীন পূজা' নামে পরিচিত।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে দেবী দুর্গাকে মাথায় রেখেই দেশমাতা বা ভারতমাতা বা মাতৃভূমির জাতীয়তাবাদী ধারণা বিপ্লবের আকার নেয়। দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই 'বন্দে মাতরম' গানটি রচিত হয়, যা 'ইনকিলাব' স্লোগানের মতোই তৎকালীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণের মন্ত্র। সুভাষ চন্দ্র বসু প্রমুখ বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা বিভিন্ন সর্বজনীন পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন এবং দেবী আবাহনের ঢাকের তালের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার ঢাকও বেজে উঠত। আর এভাবেই ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বাইরেও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চেতনার সংমিশ্রণে এক সামাজিক সম্মিলন শারদোৎসবকে পরিণত করে ধর্মনির্বিশেষে বাঙালির উৎসবে।
আজ আর সেই দিন নেই! মনে হয়, 'রিসেট বোতামে'–এ অনেক আগেই চাপ পড়ে গেছে। তাই যত উৎসব আয়োজনই হোক, পূজার মণ্ডপে যতই স্থাপত্যের অনুপম নিদর্শন থাকুক, থিমের যতই অভিনবত্ব থাকুক, বাজার অর্থনীতির অবহেলায় যতই কাঁসর বাজুক, যতই আনন্দদায়ক হোক অনুষ্ঠান—উপমহাদেশজুড়ে বাঙালির উৎসবকে ধর্মান্ধরা সুপরিকল্পিতভাবে শুধু একটি সম্প্রদায়ের উৎসবে পর্যবসিত করেছে।
ধর্মের নামে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করে একসময়ের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সামাজিক শক্তিগুলোকেও তাদের কাছে নতজানু করে ফেলেছে। দেশের বুকে স্বৈরাচারী শাসন উৎখাতে এক সফল ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর একধরনের রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ধর্মান্ধরা গোষ্ঠী সারা দেশে এক সাম্প্রদায়িক বাতাবরণ সৃষ্টি করছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আতঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত করে তোলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও তাঁদের বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে।
আবার এসব নিয়ে প্রতিবেশী দেশের কিছু গণমাধ্যম উদ্দেশ্যমূলক অতিরঞ্জিত লাগাতার প্রচার ও তাঁদের দেশের কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি উভয় ধর্মাবলম্বীদের উগ্রতাকে উসকে দিয়ে পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ছাত্ররা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর এসব কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানালেও কণ্ঠ সোচ্চার হিসেবে প্রতিভাত না হওয়ায় আতঙ্ক, শঙ্কা, অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূজা উপলক্ষে এক দিনের অতিরিক্ত ছুটির চেয়ে বেশি প্রয়োজন দেশের জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সাম্প্রতিক ছাত্র–গণ–অভ্যুথান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাসংগ্রামসহ সব জাতীয় সংগ্রামের সম-অংশীদার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনোজগতে আস্থা ও ভরসা সৃষ্টি করা।
মনে রাখা দরকার, আজ যা চলছে, সেটাই শেষ কথা নয়। শত শত বছরের ইতিহাস পরিক্রমায় একটি মুহূর্ত। আমরা হয়তো থাকব না। পরের প্রজন্ম লড়বে এবং মুগ্ধ হয়ে বাঙালি দেখবে নতুন লড়াকু 'মুগ্ধরা' অন্ধকারের শক্তিকে পরাভূত করছে।
দুর্গতি নাশ করেন বলেই তিনি দুর্গা। তাই তাঁর আগমনে অশুভ শক্তির সৃষ্ট এ সংকট মোচনের প্রার্থনা হোক ঘরে ঘরে ও মণ্ডপে। এবারের শারদোৎসবে ঢাকের তালে, আরতির নৃত্যে আর বাঁশির সুরে সৃষ্টি হোক এক উদার মানবিক সমাজ বিনির্মাণের আবাহন। এটাই দায় ও দরদের সমাজ। শারদোৎসবের ঢাকও দিক সেই ডাক।
*লেখক: আনোয়ারুল হক, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কর্মী
সম্পাদক : মোঃ আব্দুল আজিজ
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : হাউজ নং - ৬, রোড নং - ১০, সেক্টর - ১০, উত্তরা ঢাকা।
Copyright © www.nch52.com all rights reserved.- 2024