
৫২ মফস্বল ডেস্ক।।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনার ১০দিন পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর পুন:ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে দুপুরের দিকে জেলার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে তনুর লাশ উত্তোলন করা হয়। লাশের দ্বিতীয় সুরতহাল রিপোর্টে তনুর হাতে-পায়ে ও গলার পেছনে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অথচ প্রথম সুরতহাল রিপোর্টে যা উল্লেখ করা হয়নি। দুটি সুরতহালের মধ্যে এই গড়মিল থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে তনু হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকালও প্রতিবাদ সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একঘন্টা মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
তনুর লাশ মুরাদনগরের মির্জাপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে উত্তোলন করা হয়। প্রথম শ্রেণির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুত্ফুন নাহার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আজগর আলীর উপস্থিতিতে তনুর লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। এসময় সেখানে পুলিশ ও প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রসঙ্গত, মামলাটি তদন্তের জন্য জেলা সিআইডি’র নিকট হস্তান্তরের আদেশ হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকাস্থ সিআইডি পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ মামলাটি তদারকি করবেন বলে জানা গেছে।
কবর ঘিরে জনতার বিক্ষোভ পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য মির্জাপুর গ্রামে তনুর লাশ উত্তোলনের সময় কবরের পাশে জড়ো হয় হাজারো শোকার্ত জনতা। এ সময় তারা তনুর হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন তনু হত্যার সাথে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়ে শোকার্ত জনতাকে ধৈর্য্য ধরার আহবান জানান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর অধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন মামলার খোঁজ-খবর নিচ্ছে। অপরাধীরা অবশ্যই গ্রেফতার হবে বলে তিনি জানান। এসময় উপস্থিত ছিলেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ও ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল।
প্রথম ও দ্বিতীয় সুরতহালে গড়মিল:মামলার তদন্তকারী সূত্র জানায়, সিআইডির তত্ত্বাবধানে ডিবি পুলিশ তনুর লাশ উত্তোলনের পর দ্বিতীয়বার সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে। এসময় তার ২ হাতে, পায়ে ও গলার পেছনের অংশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। সিআইডি’র একটি সূত্র জানায়, তনুর প্রথম সুরতহাল রিপোর্টে তার হাত ও পায়ে কোন জখমের বিষয় উল্লেখ ছিল না।
পুন:ময়নাতদন্তে ৩ সদস্যের টিম: তনুর লাশ উত্তোলনের পর পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য একটি লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সযোগে দুপুর ২টার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে নেয়া হয়। সন্ধ্যায় হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহযোগি অধ্যাপক কামাদা প্রসাদ সাহার (কেপি সাহা) নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি টিম তনুর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। কমিটির অপর সদ্যসরা হচ্ছেন কুমেকের সহযোগী অধ্যাপক ডা. করুণা রানী কর্মকার, প্রভাষক ডা. ওমর ফারুক। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ক্রাইম সিন তনুর মাথার চুল, হাতের নখসহ কিছু অংশ নিয়ে যায়। পুনঃময়নাতদন্ত শেষে ডা. কামাদা প্রসাদ সাহা সাংবাদিকদের জানান, আদালতের নির্দেশে তনুর দ্বিতীয় বারের মতো ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ডিএনএ টেস্টের জন্য শরীরের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রথমবার ময়নাতদন্ত করেছিল একজন ডাক্তার এবং এবার ময়নাতদন্ত করেছে ৩ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় রিপোর্ট পাওয়ার আগে টেকনিক্যাল বিষয়ে কোন মন্তব্য করা যাবে না।
তনুর লাশ ফের গ্রামের বাড়িতে:সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুনঃময়নাতদন্ত শেষে তনুর লাশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে পুনরায় দাফনের জন্য তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় সঙ্গে ছিলেন তনুর বড় ভাই নাজমুল হোসেন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) একেএম জামাল।
১০ দিনেও তদন্তে অগ্রগতি নেই :তনুর হত্যাকান্ড নিয়ে পুলিশ, র্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ১০দিন অতিবাহিত করলেও তদন্তে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে। কুমিল্লা জেলা ছাড়াও দেশব্যাপী প্রতিদিনই এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মানববন্ধন অব্যাহত রয়েছে। তবে একাধিক সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত নিয়ে র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মাঝে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ৩টি সংস্থার জেরার মুখে তনুর পরিবারের এখন ত্রাহি দশা।
তদন্তে সহায়তায় ৬ সদস্যের কমিটি: তনু হত্যা তদন্তে সহায়তা করতে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেছেন সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক হিমায়েত হোসেন। এই কমিটিতে রয়েছেন: আবদুল কাহহার আকন্দ, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান, কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার অথবা তার প্রতিনিধি, সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন আহমেদ, সহকারী পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হক ও পরিদর্শক খন্দকার গোলাম শাহ নেওয়াজ।
ঢাবিতে মানববন্ধন, শিক্ষক সমিতির নিন্দা:বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, তনু ধর্ষণ ও হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল মানববন্ধন করেছেন। দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে এই মানববন্ধন করা হয়। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়। এসময় শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করেন।
এদিকে গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তনু হত্যার নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত এলাকায় এ ধরণের পাশবিক হত্যাকান্ড অনভিপ্রেত ও অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের ধারণা ছিল যেহেতু সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণাধীন একটি সুরক্ষিত এলাকায় হত্যাাকান্ড ঘটেছে, সেহেতু এই সময়ের মধ্যেই প্রকৃত অপরাধীকে আটক করা সম্ভব হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি ঘটনার ৯ দিন অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি প্রকৃত খুনিকে সনাক্ত করে গ্রেফতার করা যায়নি- যা অত্যন্ত রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। শিক্ষক হিসেবে আমাদেরই সন্তানতুল্য একজন ছাত্রীর প্রতি এহেন নির্মমতায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ।
সাংবাদিক সম্মেলনে চার দফা দাবি: গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে তনু হত্যার প্রতিবাদ ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়। এসময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী উযমা তাজরিয়ান। তিনি বলেন, ঘটনার ১০ দিন অতিবাহিত হলেও ঘটনার কোন সুষ্ঠু অগ্রগতি আমরা আজো দেখতে পাইনি। গত ২৭ মার্চ সরকারকে তনু হত্যার বিচারের দাবিতে ২৪ ঘন্টার সময় বেঁধে দেই। কিন্তু দাবিসমূহ আদায় না হওয়ায় আগামী ৩রা এপ্রিল সারা দেশে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহ্বান করছি। তবে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এ ধর্মঘটের আওতামুক্ত থাকবে। একই দিন বিকাল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ছাত্র, শিক্ষক, জনতার সংহতি সমাবেশেরও ঘোষণা দেন তিনি।
তনু হত্যার রহস্যও উন্মোচিত হবে, বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : দেশের সকল হত্যাকাণ্ডের মতো তনু হত্যার রহস্যও উন্মোচন করা হবে। হত্যাকারী যারাই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ) আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তদন্তে যেন কোনো ধরনের গাফিলতি না হয়, সেজন্যই তনুর মরদেহ আবারো কবর থেকে উঠানো হয়েছে। আইনের উর্ধ্বে কেউ নেই, এ হত্যার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে তনুর হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল সিলেট, বরিশাল, বাগেরহাট, রংপুর, ফেনী, নাটোর, বি.বাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সম্পাদক : মোঃ আব্দুল আজিজ
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : হাউজ নং - ৬, রোড নং - ১০, সেক্টর - ১০, উত্তরা ঢাকা।
Copyright © www.nch52.com all rights reserved.- 2024