
মনোজ মিত্র: বাঞ্ছারামের বাগান থেকে শেষ বিদায়
গতকাল, মঙ্গলবার সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কলকাতার বিখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যকার মনোজ মিত্র (৮৬) হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন।
হাসপাতাল থেকে মনোজ মিত্রর দেহ প্রথমে নেওয়া হয় তার সল্ট লেকের বাসায়। তারপর মরদেহটি কিছুক্ষণ রবীন্দ্র সদনে শায়িত রাখা হয়। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন জগন্নাথ বসু, উর্মিমালা বসু, ব্রাত্য বসু, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, দেবশঙ্কর হালদার, ইন্দ্রনীল সেন, মেঘনাদ বসু, দুলাল লাহিড়ী, দেবাশিস কুমার, নীল মুখোপাধ্যায়সহ কলকাতার বিনোদন জগতের অনেকে। রবীন্দ্র সদনে তাকে গান স্যালুট দেওয়া হয়। এরপর গাড়িতে করে মরদেহ শেষকৃত্যের জন্য কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
মনোজ মিত্রর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র হলেন বাঞ্ছারাম। আধুনিক যুগেও বাংলা সিনেমার দর্শকদের মনে নাড়া দিচ্ছে বাঞ্ছারাম কাপালির হাহাকার। দিনভর নিজের হাতে গড়া ফুল-ফলের বাগান নিয়ে মগ্ন এই অশীতিপর বৃদ্ধকে কে ভুলতে পারে! এই বাগান ছিল তার প্রাণের চেয়েও প্রিয়।
১৯৩৮ সালের ২২ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা জেলার ধূলিহর গ্রামে তার জন্ম। ওই গ্রামেই তার শৈশব কেটেছে। পূজার সময় বাড়ির উঠানে যাত্রা ও নাটক দেখে সে ছোট থেকেই অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ১৯৫০ সালে ১২ বছর বয়সে সে কলকাতায় চলে আসে। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে সে। এই কলেজেই দর্শনে স্নাতক পড়ার সময় নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয় মনোজ মিত্র। সেই সময় পার্থপ্রতিম চৌধুরীর মতো বন্ধুদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে নাটকের দল সুন্দরম। সেই থেকেই সে নাটকের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে জড়িয়ে পড়ে। মনোজ নিজেই বলেছিলেন, ‘প্রথমে আমি নাট্যকার, তারপর অভিনেতা, তারপর নির্দেশক।’
১৯৫৯ সালে তিনি তার প্রথম নাটক ‘মৃত্যুর চোখে জল’ লিখেন। কিন্তু ১৯৭২-এ লেখা নাটক ‘চাকভাঙা মধু’ তাকে খ্যাতি এনে দেয়। মনোজ মিত্রর লেখা শতাধিক নাটকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘দর্পণে শরৎশশী’, ‘নরক গুলজার’, ‘সাজানো বাগান’, ‘নৈশভোজ’, ‘কাল বিহঙ্গ’, ‘অশ্বত্থামা’, ‘মেষ ও রাখাল’, ‘অলকানন্দর পুত্রকন্যা’ ইত্যাদি।
সত্যজিৎ রায় ও তপন সিনহা ছাড়াও বিভিন্ন পরিচালকের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রেও তিনি কাজ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বাঞ্ছারামের বাগান’, ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘আদালত ও একটি মেয়ে’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘বৈদুর্য্য রহস্য’, ‘গণশত্রু’, ‘অন্তর্ধান’, ‘চরাচর’, ‘হুইলচেয়ার’, ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘উমা’ ইত্যাদি। ১৯৯৮ সালে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবিতে অভিনয় করে প্রশংসিত হন তিনি।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের আগে তিনি বিভিন্ন কলেজে দর্শন বিষয়েও শিক্ষকতা করেন।
নিজের সৃষ্ট এই চরিত্রটিকে মঞ্চে যেমন জীবন্ত করে তুলেছিলেন মনোজ মিত্র, তেমনি তপন সিনহার পরিচালনায় পর্দায়ও করেছিলেন স্মরণীয়।
এক সাক্ষাৎকারে মনোজ মিত্র জানিয়েছিলেন যে, বাঞ্ছারাম চরিত্রটি তিনি বাংলাদেশ থেকেই পেয়েছিলেন। তার ভাষ্য, ‘বাঞ্ছারাম আসলে আমার দেখা একজন জীবন্ত মানুষ। আমার বৃদ্ধ পিসিমা একদিন বললেন, “চলো মনু, তোকে একটি পানের বাগান দেখিয়ে আনি।” পিসি সেই পানের বরজের কাছে গিয়ে “বাঞ্ছা…বাঞ্ছা” বলে চিৎকার করে ডাকলেন। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ দেখি, পাটকাঠি দিয়ে ঘেরা পানের বরজ থেকে কেবল একটি মাথা বেরিয়ে পিসির দিকে তাকিয়ে। সেটি ছিল এক বৃদ্ধ মানুষের মাথা। মাথার চুল থেকে দাড়ি—সবটাই সাদা।’
তিনি আরও বর্ণনা করেছিলেন, ‘বাঞ্ছারাম সব সময়ই কুঁজো হয়ে থাকেন, কুঁজো হয়েই হাঁটেন। তার পরনে একটি নোংরা খাটো ধুতি, খালি গা। তার চেহারাটা ভয়ংকর। আমি ভয়ে পিসির গায়ে সেঁটে দাঁড়ালাম। বাঞ্ছারাম আমার কাছে এসে বললেন, “কী রে খোকা, তুমি তো খুব ভয় পেয়েছ?” আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি তখন বললেন, “দেখো, শুধু এই পানের বরজই নয়, এখানকার ফুল, ফল, আম, কাঁঠালের গাছগুলোও সব আমার। এই গাছগুলো আমার ছেলে-মেয়ে। আমি তাদের জন্ম দিয়েছি, তাদের বড় করেছি। তারা আমাকে বাবার মতো ভালোবাসে।” আমি তখন আর কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ভয়ে আমার প্রাণ উড়ে গেল। তিনি কাছে এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে টেনে নিয়ে গেলেন তাঁর ভাঙা কুঁড়ের দিকে। সামনের একটি ক
সম্পাদক : মোঃ আব্দুল আজিজ
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : হাউজ নং - ৬, রোড নং - ১০, সেক্টর - ১০, উত্তরা ঢাকা।
Copyright © www.nch52.com all rights reserved.- 2024