প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ৪, ২০২৬, ৯:৪৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ১১, ২০১৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
ভারতে আতশবাজি বিস্ফোরণে নিহত শতাধিক

৫২ আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
ভারতের কেরালা রাজ্যের কোল্লাম শহরের পারাভুর এলাকার পুত্তিঙ্গাল দেবীর মন্দিরে আতশবাজির বিস্ফোরণে অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে সাড়ে তিনশর বেশি মানুষ। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। উত্সবের জন্য জড়ো করে রাখা আতশবাজির গাদায় বিস্ফোরণের পর এই অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়। গতকাল রবিবার স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে তিনটার দিকে এই ঘটনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। রাজ্য সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। খবর এনডিটিভি, দ্য হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজার পত্রিকার।
হিন্দুদের নববর্ষ উত্সব উপলক্ষে আতশবাজি জড়ো করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো কেরালার মানুষও আগামী ১৪ এপ্রিল বর্ষবরণের উত্সব করবে। মালায়ালাম পঞ্জিকা অনুযায়ী, মেদাম মাসের প্রথম দিন এই উত্সব হয়, যার নাম বিশু। নতুন পোশাকে সেজে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই উত্সবে অংশ নেন। আর কেরালায় বিশু উত্সবে অন্যতম অনুষঙ্গ হলো আলোকসজ্জা ও আতশবাজির প্রদর্শনী। এই উত্সব উপলক্ষে প্রায় ১৫ হাজার ভক্ত সেখানে হাজির হয়েছিলেন।
কোল্লামের পুত্তিঙ্গাল মন্দিরে এই আতশবাজির প্রদর্শনী চলার কথা ছিল শনিবার মাঝরাত থেকে গতকাল সকালের আলো না-ফোটা পর্যন্ত, আর সেই উপলক্ষে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু ভোররাতের দিকে আচমকাই একটি বাজির স্ফুলিঙ্গ এসে পড়ে জড়ো করে রাখা আতসবাজির স্তূপে, আর নিমেষে সেখানে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে ভয়াবহ আগুন। প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। ছড়িয়ে পড়া আগুনের শিখায় বহু মানুষ প্রাণ হারান, প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষের ধাক্কাধাক্কি আর হুড়োহুড়িতেও হতাহত হন অনেকে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভেঙে পড়ে মন্দির চত্বরের একটি দোতলা ভবন, যেটির চারদিকে মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভবনটি ধ্বসে পড়ার ফলেই বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণের ফলে এক কিলোমিটার দূরবর্তী ভবনগুলোও কেঁপে ওঠে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তারা জানতেন এই আতশবাজি প্রদর্শনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। তিনি বলেন, আমরা বন্ধুরা মিলে আতশবাজি দেখতে এসেছিলাম, কিন্তু অগ্নিকান্ডে আমার বন্ধুর হাত-পা কাটা গেছে, ও এখন হাসপাতালে ভর্তি। গিরিজা নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, কাছেই আমার বাড়ি। মনে হলো ছোটখাটো ভূমিকম্প হচ্ছে।
মন্দিরের দুটো গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে পাল্লা দিয়ে প্রতি বছরই আতশবাজি ফাটায়। এবার জেলা প্রশাসন তার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু আতশবাজি তার অনেক আগে থেকেই জড়ো করা শুরু হয়ে গেছিল, ফলে তা আর বন্ধ করা হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী উম্মেন চণ্ডীকে এই অগ্নিকান্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, এই ট্র্যাজেডির মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যকে সবরকমভাবে সাহায্য করছে। রাজনাথ সিং বলেছেন, কোল্লামের এই অগ্নিকান্ড খুব বড় মাপের একটা দুর্ঘটনা, সকালে খবর পাওয়ামাত্র আমি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি, জানিয়েছি আমরা যে কোনও রকম সাহায্যে প্রস্তুত। আগুনে নিহতদের স্বজনদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চান্ডি দশ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন। আহতদের দেয়া হবে দুই লাখ রুপি।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা সকাল সাড়ে ৬টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন, শুরু হয় উদ্ধারকাজ। মারাত্মক দগ্ধদের পাঠানো হয় কেরালার রাজধানী তিরুঅনন্তপুরমে। কেরালা পুলিশের প্রধান টিপি সেনকুমার গণমাধ্যমকে বলেন, অনেকের দেহ পুড়ে এতোটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, সেগুলো আর চেনার উপায় নেই। পরিচয় শনাক্ত করতে তাদের ডিএনএ সংরক্ষণ করা হবে। কেরালার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা বলেছেন, এই মন্দিরে প্রতি বছরই বার্ষিক আতশবাজি উত্সব হয়। আমরা আটকে পড়া মানুষজনকে উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।
মন্দিরের আহতদের সেবায় নিযুক্ত করা হয় বার্ন কেয়ার বিশেষজ্ঞদের। উদ্ধারকাজের জন্য পাঠানো হয় নৌ ও আধা সামরিক বাহিনী। উদ্ধারকার্যে গতি আনতে এয়ারফোর্সের ১০টি কপ্টার, মিগ ১৭ ও অত্যাধুনিক হাল্কা চপার ব্যবহার করা হয়। মন্দিরে হতাহতদের সহায়তা দিতে হেল্পলাইনও খোলা হয়। আহতদের শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পুলিশ মন্দিরের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, মন্দিরের এই বার্ষিক অনুষ্ঠানে আতশবাজি পোড়ানো নিয়ে পুলিশের কাছে আবেদনপত্র্ জমা দেননি মন্দির কর্তৃপক্ষ। পোড়া মৃতদেহের মধ্যে ৪০টি দেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
ঘটনার ভয়াবহতায় শিউরে উঠেছেন দেশবাসী। এই অগ্নিকাণ্ডে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেরালার একটি জনসভা বাদ দিয়ে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণে যান প্রধানমন্ত্রী। এই সময় তার সঙ্গে ১৫ জনের একদল বার্ণ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকও ছিলেন। তিনি আহতদের দেখতে হাসপাতালও পরিদর্শন করেন। কোল্লাম রওনা হওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী টুইট করে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী উম্মেন চণ্ডীকে অনুরোধ করেন, তিরুঅনন্তপুরম বিমানবন্দরে তার জন্য যেন কোনও সরকারি প্রোটোকলের ব্যবস্থা করা না হয়। এর আগে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডাকে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে বলেন প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেস ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীও কংগ্রেসের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার জন্য দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি করেছে কংগ্রেস। মন্দিরের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শোক প্রকাশ করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু, উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি।
সম্পাদক : মোঃ আব্দুল আজিজ
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয় : হাউজ নং - ৬, রোড নং - ১০, সেক্টর - ১০, উত্তরা ঢাকা।
Copyright © www.nch52.com all rights reserved.- 2024