গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের চার নং ওয়ার্ড পশ্চিম ডগরী গ্রাম, সাত নং ওয়ার্ডের কাঞ্জানুল গ্রাম ও ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের এক নং ও দুই নং ওয়র্ডের বানিয়ার চালা ও শিরিরচালা গ্রামের প্রায় দু্ই হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ডায়নামিক পলিমার, বিডি ফুড, ডেকো সিরামিকস, ইভিটেক্স ও মন্ডল ইন্টিমেটস নামের শিল্পকারখানাগুলো পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করায় জলাবদ্ধতার এই দুর্ভোগে পরেছেন গাজীপুর সদর উপজেলার হাজার হাজার বাসিন্দা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মির্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডগরী ও নয়াপাড়া এলাকার মধ্যবর্তী বাইদে প্রায় এক’শ একর কৃষি জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, তার পার্শবর্তী প্রায় দুইশত পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কৃষক আব্দুল জলিল জানান, আমি কৃষি কাজ করে পরিবার চালাই পানিতে আমার ধান ডুবে গেছে আমি সহ প্রায় এক’শ কৃষক এখন কি খেয়ে বাচবো? তিনি পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা সহ সরকারের কাছে সাহায্য চান। ইউপি সদস্য এমদাদুল হক জানান, প্রায় চার বছর আগে ডাইনামিক পলিমার নামের একটি কারখানা বাইদের মাঝখানে কৃষি জমি কিনে কারখানা নির্মাণ করেন, তখন এলাকাবাসী ও কৃষকেরা ফসলি জমির পানি নামার জায়গা রেখে কারখানা নির্মাণের দাবি করলে কারখানা কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রাখেননি তারা এলাকাবাসীর সাথে প্রতারণা করেছেন । এরপর থেকে বৃষ্টি হলেই আমার ৪ নং ওয়ার্ডের ১শ একর কৃষি জমি ও প্রায় ২শ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পরেন। বিএনপি নেতা নূর হোসেন সরকার জানান, মির্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডগরী এলাকার অধিকংশ মানুষ কৃষি কাজ করে জিবিকা নির্বাহ করেন, তিনি কৃষি জমির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানান। ডাইনামিক পলিমারের এডমিন ম্যানেজার মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান জানান, আমাদের বাউন্ডারির বাহিরে দুই পাশে দুই ফিট করে জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, এলাকাবাসী যদি চান সেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা করে নিতে পারেন আমরাও প্রয়োজনে সহযোগীতা করবো।
মির্জাপুর ইউনিয়নের সাত নং ওয়ার্ডের কাঞ্জানুল গ্রামের অবস্থা আরো ভয়াবহ, এখানে গত এক সপ্তাহের বর্ষণে প্রায় এক হাজার পরিবারের বসত ঘর ও রান্না ঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে, খাবার ও বাসস্থানের অভাবে মারা যাচ্ছে গবাদি পশু, শুকনো খাবার খেয়ে জিবন নির্বাহ করছেন অনেক পরিবার, পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শিশুরা। সদর উপজেলা বিএনপির আহবায়ক সদস্য জসিম উদ্দিন জানান, কাঞ্জানুল গ্রামের নামকরণ হয়েছে যে পানি নামার নুল থেকে, সেই নুল ই আজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই গত আট দশ বছর ধরে এই গ্রামের মানুষ সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। জেলা যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন জানান, কাঞ্জানুল গ্রামের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথটি বন্ধ করে বিডি ফুড ও ডেকো সিরামিকস নামের কারখানাগুলোর স্থাপনা নির্মাণ করায় এই গ্রামের এক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছেন। সাত নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম জানান, পানি নিষ্কাশনের পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় এই এলাকার আড়াইশো বিঘা কৃষি জমির ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়, প্রতি বছর একই সময়ে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জিবন যাপন করেন এবং শিশুরা নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তিনি কর্তৃপক্ষের নিকট উক্ত এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য সাহায্যের আবেদন জানান। বিডি ফুডের ম্যানেজার বাহাদুর জানান, বিডি ফুডের ভেতরে কারো জায়গা নেই পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব স্থানীয় জনপ্রতিনিধির, জলাবদ্ধতার বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই।
ভাওয়ালগড় ইউনিয়নের বাঘের বাজারের পূর্ব পাশে এক নং ও দুই নং ওয়র্ডের বানিয়ার চালা ও শিরিরচালা গ্রামে সামান্য বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইভেন্স গ্রুপ ও মন্ডল গ্রুপের শিল্পকারখানা নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রাখায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে সড়ক ও বসতবাড়ি তলিয়ে যায়। এতে পানি বন্দি হয়ে পরেন প্রায় এক হাজার পরিবার। এলাকাবাসীর দাবি, পাশের আর্টিসান সিরামিকস এবং ফরমুসা পলি কটন বিডি লিমিটেড এর নিজস্ব ড্রেনেজ ব্যবস্থার সাথে তাদের এলাকার ড্রেনেজ লাইনের সংযোগ স্থাপন করা। তাহলে শিরিরচালা ও বানিয়ারচালা এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ কমবে। জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিরিরচালা জামি’আ ইসলামিয়া মদিনাতুল উলুম কওমি মাদ্রাসা। সামান্য বৃষ্টিতেই মাদ্রাসার একাধিক কক্ষে পানি প্রবেশ করে, ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও আবাসিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দ্রুত স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। ইভিটেক্স গ্রুপের জিএম মনিরুজ্জামান জানান, আমারদের নিজস্ব ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকলেও আমাদের পানি নিষ্কাশনের জন্য আলাদা পাম্পের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা কারো জমিতে পানি ফেলিনা। মন্ডল ইন্টিমেটসের এডমিন ম্যানেজার জানান, আমাদের নিজস্ব ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই তবে তার জন্য আমরা কাজ করছি স্থানীয় বিভিন্ন বাধার জন্য নিজস্ব ড্রেনেজ ব্যবস্থা করতে পারছিনা।
গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ সাজ্জাত হোসেন জানান, আমাকে এই বিষয়গুলো নিয়ে কেউ জানায়নি আপনার মাধ্যমে জেনেছি, আমি খোঁজ নিয়ে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।
স্থানীয় বাসিন্দারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন। তাদের একটাই প্রত্যাশা, বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগের অবসান হোক, মানুষ যেন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে এবং শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জীবন যেন জলাবদ্ধতার কাছে জিম্মি না থাকে।