ন্যায়বিদদের মতে, বিচারপতিদের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগ করে তাদের বিচারকাজ থেকে সরিয়ে রাখা একটা সঠিক পন্থা নয়। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, পদত্যাগের দাবির মুখে বিচারকাজ থেকে অপসারণ করা হলে, তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গতকাল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হাইকোর্ট ঘেরাও করে আওয়ামী লীগের ‘ফ্যাসিস্ট’ বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবি করেছে। অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী আইনজীবী সমাজ ‘দলবাজ ও দুর্নীতিবাজ’ বিচারপতিদের পদত্যাগের দাবিতে একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছে। আর জাতীয় নাগরিক কমিটি-লিগ্যাল উইং ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ বিচারপতিদের তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণের দাবি জানিয়ে একটি প্রতিবাদ সভা করেছে।
প্রতিবাদের মুখে, হাইকোর্টের ১২ জন বিচারপতিকে বিচারকাজ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে এমন পদ্ধতিতে, যে পদ্ধতিতে বিচারকদের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি করা হচ্ছে, সেটাকে শৃঙ্খলাহীন বলে মনে করা হচ্ছে বলে পদত্যাগের দাবির প্রেক্ষিতে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, এটা একটি নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছে। কোনো বিচারক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে সেটা লিখিতভাবে জানানোর জন্য প্রধান বিচারপতি একটি হটলাইন সেবা চালু করেছেন। এই সেবা ব্যবহার না করে পদত্যাগ এবং অপসারণের দাবিতে যদি চাপ দেওয়া চলতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে কোনো বিচারপতিই এটা থেকে রেহাই পাবেন না।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘কিছু কিছু বিচারকের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব, অনুপযুক্ততা এমনকি দুর্নীতির অভিযোগ থাকতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে, এই অভিযোগের কারণেই বিচারকরা জিম্মি হয়ে যাবেন, কিংবা তাদের বিচারকাজ থেকে সাময়িকভাবে অপসারিত করা হবে। এটা হলে তো বিচারকদের রাগ, অনুরাগ বা বিরাগের উর্ধ্বে উঠে ন্যায়বিচার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, কোনো রায়ে কে ক্ষুব্ধ হচ্ছে, তা মাথায় রেখে যদি তাদের রায় দিতে হয়, তাহলে জনগণের জন্য বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আর কোনো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে না।’
শাহদীন মালিক মনে করেন, ‘পদত্যাগের দাবির মুখে বিচারকাজ থেকে অপসারিত হওয়া হচ্ছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানা। বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করা এবং সঠিকতা-ভুল নির্ধারণ করার একটি প্রক্রিয়া সংবিধানে বর্ণিত আছে। কয়েকজন বিচারককে বিচারকাজ থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, মোটের ওপর এই ঘটনাগুলো খুবই পরিতাপের।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া চাপ প্রয়োগের পদ্ধতিকে অশোভন বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, এইগুলো এড়ানো উচিত ছিল। দু’দিন পরপর ছাত্ররা এসে দাবি জানাতে থাকবে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে একটা পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এর কোনোটাই ঠিক না। এতে বিচার বিভাগের গুরুত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর আগেও যেমনটা হয়েছিল, ছয়জন আপিল বিভাগের বিচারপতির ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াটা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেছেন, ‘নিয়মের মধ্য দিয়ে চলতে হবে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই নিয়মটাকেই সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করেছে। এখন আমরা নিয়মকে না মেনে জোর করে কাজ করার চেষ্টা করছি, যা এড়িয়ে চলা উচিত।’