**কুমিল্লায় আওয়ামী ছায়া তলে ‘দুর্বৃত্তায়নের রাজা’ বাহার**
কুমিল্লা-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহাউদ্দিন বাহার সাধারণত এসব শ্রেণীর মানুষকেই ঘিরে রাখতেন- অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, খুনি মামলার আসামি ও তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। আর এ কারণেই কুমিল্লার জনগণ তাকে ভয় পেত। এসব অস্ত্রধারী দলবলের সহায়তাতেই দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কুমিল্লা শহর ও আশপাশের এলাকার রাজনীতি ও অপরাধ জগত দুটোই নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন তিনি। তাঁর এই ‘দুর্বৃত্তায়ন’ এতোটাই প্রবল ছিল যে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও এখন বলছেন, তিনিই নির্ধারণ করে দিতেন কুমিল্লায় “ন্যায়” এবং “অন্যায়” কী। তিনি কুমিল্লায় দুর্বৃত্তায়নের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশে যেভাবে দুর্বৃত্তায়ন ব্যাপক হয়েছে, কুমিল্লায় তার নেতৃত্ব দিয়েছেন বাহার। গত ১৫ বছরে নিজের অনুসারী ও ঘনিষ্ঠদের দলের বিভিন্ন পদে বসিয়েছেন তিনি। তাদের অনেককেই তিনি জনপ্রতিনিধি বানিয়েছেন। কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে জ্যেষ্ঠ নেতাদের বঞ্চিত করে নিজের মেয়ে তাহসীন বাহারকে বসিয়েছিলেন। গত মার্চ মাসে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদের উপনির্বাচনে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তাহসীনকে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী ঘোষণা করেন তিনি।
গত ১৫ বছরে কুমিল্লায় বাহার যা চেয়েছেন, তাই করেছেন। দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, নিজ দলের বিরোধী পক্ষকে দমনসহ নানা অপকর্ম করেছেন বাহারের ঘনিষ্ঠরা। গত ১৫ বছরে কুমিল্লা শহরে অন্তত পাঁচজন দলীয় নেতা-কর্মী খুনে বাহারের সহযোগীরা সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে মেয়র হলেও তাহসীন বেশিদিন দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনিও বাবা বাহারের সঙ্গে পালিয়ে যান।
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহার ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য হন। এর পর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আরও তিনবার কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর, সিটি করপোরেশন ও কুমিল্লা সেনানিবাস) আসনের সংসদ সদস্য হন তিনি।
গত সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলির বিভিন্ন পর্যায়ের ১১ জন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাদের মতে, বাহারের বিরোধিতা করায় কমপক্ষে ২০ জন নেতা-কর্মী গত ১৫ বছরে হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাতের বা পায়ে অভ্যন্তরীণ জখম রয়েছে।
কুমিল্লা ক্লাবের নিয়ন্ত্রণও ছিল বাহারের হাতে। তাঁর সম্মতি ছাড়া কেউ কুমিল্লা ক্লাবের সদস্য হতে পারত না। এছাড়াও, এই ঐতিহ্যবাহী টাউন হল ভেঙে বহুতল বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করছিলেন বাহার।
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা নূর উর রহমান তানিমও একসময় বাহারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কুমিল্লায় দখল, চাঁদাবাজি ও নানা অপকর্ম করেছেন বাহার। তাঁর বিরোধিতা করায় দলের অনেক নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কয়েকজন পঙ্গু হয়ে গেছেন। আবার কয়েকজন খুনও হয়েছেন। এইসব ঘটনার পেছনেই বাহার ছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর কুমিল্লার বাসিন্দারা বাহারের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেন। সেই সঙ্গে বাড়ির গ্যারেজে থাকা তিনটি গাড়িও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আগুন দেওয়া হয় নতুন কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ভবনকেও, যেখানে এখন আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় অবস্থিত। জানা যায়, বিরোধপূর্ণ জমি দখল করে দলীয় কার্যালয় নির্মাণ করেছিলেন বাহার। সেদিনই কুমিল্লা ক্লাব এবং টাউন হলেও আগুন দেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দখল এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্যই বাহার কুমিল্লা ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ নেন। এ ছাড়া, ঐতিহাসিক টাউন হল ভেঙে বহুতল বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। এইসব নিয়েও স্থানীয়রা অসন্তুষ্ট ছিলেন।
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক আনিসুর রহমান মিঠু প্রথম আলোকে বলেন, কুমিল্লায় চূড়ান্ত পর্যায়ে দুর্বৃত্তায়ন করেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য বাহার। এ কারণেই তাঁকে কুমিল্লা থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের কৃতকর্মের জন্যই একজন রাজনীতিবিদের এমন পরিণতি হয়েছে বলে ম