ট্যাগের কলুষতা
কেউ কাউকে পেটানো বা খুন করার জন্য ধুঁকছিট দেয়ার মতো করে অজুহাত দরকার হয়। অজুহাত খুঁজে বের করার জন্য সূচ খুঁজতে ময়দার মাঠে খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয় না। শুধু ব্যক্তির মান-ইজ্জতের ওপর "বেতমিজ", "বজ্জাত" এর মত অপমানজনক তকমা লাগিয়ে দিতে হয়। কিংবা "আপরাধী" বলে তকমা লাগায়।
একবার এমন তকমা বা লেবেল ভালোভাবে জড়িয়ে গেলে, সেই ব্যক্তি ফুটো টায়ারের মতো সীস দিয়ে উচ্চ মর্যাদা থেকে নীচে নেমে আসে। একজন নামকরা ধনী লোকও এরপর দাগি আসামির মতো হয়ে যায়।
সামাজিক কলঙ্ক বা "কালিমা"তে ভুগতে থাকা ব্যক্তিকে তার সবচেয়ে কাছের আত্মীয়, যেমন মা-খালাম্মা, মাসি-পিসি পর্যন্ত তাকে তিরস্কার করে। কাছের বন্ধুরা ‘তোর মতো লুকিয়ে লুকিয়ে যে এত বাজে কাজ করে’ বলে ঘৃণার কথা বলে। স্বয়ং ভাইবোনও তাকে সমর্থন না করে দূরে সরে যায়। প্রিয়জনেরাও এড়িয়ে চলে, তার জীবন নিঃসঙ্গতায় ভরে ওঠে।
ট্যাগ লাগানো একটি ভদ্রোচিত শব্দ, যার দ্বারা বোঝায় আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত কাউকে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করা। এই ট্যাগ শপিং ব্যাগের প্রাইস ট্যাগ নয়, ফেসবুকের হ্যাশট্যাগও নয়। এটি হচ্ছে একজন ব্যক্তির মর্যাদাকে হেয় করা, তাকে অপদস্থ করার শৈলী।
যদিও বাঙালির স্বভাব হলো অপরের ওপর কালির ছিটে এবং সেইসাথে ‘আইক্ক্যা বাঁশ’ দিয়ে আঘাত করা; তবু এই ট্যাগ লাগানোর খেলায় দলে দলে লোক রয়েছে, যাদের খ্যাতি আত্মঘাতী বাঙালিরও ওপরে।
ফেসবুকে এক সময় ফ্যাসিবাদী নেতাদের উদ্দেশ্যে যেসব মানুষ ‘দোসর ওগো, দোসর আমার, দাওনা দেখা’ টাইপের স্ট্যাটাস দিত, কিংবা বর্তমানে পদচ্যুত নেতা, লেখক বা কবির সাথে চা-টোস্ট খেয়ে ছবি তুলত, তারা এখন ‘রোস্ট’ হচ্ছে। সংক্ষেপে তাদের বলা হচ্ছে "ফ্যাসিবাদের দোসর"।
সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ট্যাগ ছিল ‘টেররিস্ট’। শান্তির কথাবার্তা বলা বুদ্ধের মতো ব্যক্তি, প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ছিলেন এই ট্যাগের হোলসেল সরবরাহকারী। আরব থেকে আফগানিস্তান, আমেরিকা থেকে পাকিস্তান; যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের সাথে সাথে বুশ তাদের গায়ে "টেররিস্ট" ট্যাগ ট্যাটুর মতো লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
বুশের রিপাবলিকান পার্টির জন ম্যাককেইনের সাথে ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে টাইট ফাইট হয়েছিল। সেই সময় ওবামার বাবা-মার বংশপরিচয় এবং তার পিতার নাম "হুসেইন" তুলে রিপাবলিকানরা ওবামার গায়ে "আরব" ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করেছিল।
ওবামাও বুশের "যুদ্ধং শরণং গচ্ছামি" ঘরানার ট্যাগ লাগানো শিখে ফেলেছিলেন। ট্রাম্প তা আরও মুখস্থ করে ফেলেছেন। বাইডেনও পিছিয়ে নেই। সাদ্দাম থেকে গাদ্দাফি, কেউই "টেররিস্ট" ট্যাগের হাত থেকে রেহাই পাননি।
‘টেররিস্ট’ ট্যাগ বাংলায় "জঙ্গি" নামে অনুবাদ হয়েছে। দেশে জঙ্গি ছিল। হয়তো এখনও আছে। কিন্তু সর্বত্র মানুষ ধরে জঙ্গি ট্যাগ লাগিয়ে মাঝ রাতে তাদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে যাওয়া; সেখানে আগে থেকে পুলিশের গোপন অভিযান করে রাখা জঙ্গিদের দিক থেকে গুলি চালানো, এবং নিত্যদিনের মতো পুলিশের সঙ্গে থাকা জঙ্গির সহযোগী জঙ্গিদের গুলিতে নিহত হওয়ার এসব গল্প শুনতে শুনতে এবং এসব ঘটনার সংখ্যা গুনতে গুনতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গেছি।
আমরা বিভিন্ন রকম ট্যাগের ব্যবহার দেখেছি, যেমন "রাজাকারের বাচ্চা", "স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি", "শাহবাগি", "হেফাজতি", "র-এর এজেন্ট", "ফ্যাসিবাদী"। "পাকিস্তানের দালাল"কে সংক্ষেপে "পাদা" এবং "ভারতের দালাল"কে "ভাদা" হিসেবে ট্যাগ করা হয়েছে। কিন্তু কেউ কাউকে কখনো "বাংলাদেশের দালাল" বা "বাদা" হিসেবে ট্যাগ করেছে বলে শোনা যায়নি।
২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কারের যুক্তিসংগত দাবি উড়িয়ে দিয়ে রাজপথের রাজনীতিবিদদের প্রজাতন্ত্রের একজন মন্ত্রী "রাজাকারের বাচ্চা" ট্যাগ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে সেই একই দাবিতে নেমে আসা ছাত্রছাত্রীদের গায়েও একই ট্যাগ দাগাতে চেয়েছিলেন খোদ পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী। এটা কোনো সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ বা কষ্ট দেওয়া কথা ছিল না; এটা ছিল একটা রুক্ষ, ভয়ংকর গালি।
অনেক "বাচ্চা" জানে, তাদের বাবা রাজাকার ছিলেন না, কিন্তু শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে যুক্তিসংগত প্রশ্ন তোলার জন্য তাদের "রাজাকারের বাচ্চা" বলে গালি খেতে হয়েছে। আমরা এক সাবেক বিচারপতিকে একটি লাইভ টক শোতে "দেশে চার কোটি রাজাকারের বাচ্চা আছে" বলে চিৎকার করতে শুনেছি। এমনকি সে