৫২ আইন আদালত ডেস্ক।।
বিচারিক আদালতের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) দণ্ড স্থগিত করা হলে কিংবা আপিল চলাকালে কোনও ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দণ্ড স্থগিত কিংবা বাতিল হলে ওই ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নিতে কোনও বাধা থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন আদালত।
দুর্নীতির অভিযোগে বিচারিক আদালতে দায়ের হওয়া মামলার দণ্ড (কনভিকশন অ্যান্ড সেন্টেন্স) স্থগিত চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে মঙ্গলবার (২৭ নভেম্বর) বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন।
দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমানসহ পাঁচ নেতার দণ্ড স্থগিত চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে দিয়েছে বাংলাদেশ হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, নিম্ন আদালতে দুই বছরের বেশি দণ্ড হলে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তবে আপিল বিভাগে দণ্ড স্থগিত ও বাতিল হলেই কেবল অংশ নিতে পারবেন।
আজ (মঙ্গলবার) বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বিএনপি নেতা আমান উলাহ আমান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ওয়াদুদ ভূঁইয়া, মো. মশিউর রহমান ও মো. আব্দুল ওহাবের পক্ষে দণ্ড ও সাজা বাতিলের ওই আবেদন করা হয়েছিল।
আদেশের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, “পাঁচ বিএনপি নেতার আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পাঁচটি আবেদন করা হয়েছিল, যার মূল বিষয় ছিল দণ্ড স্থগিত করা। শুনানি করে আদালত তা খারিজ করে দিয়েছে। মূলত একটাই কারণ, সেটা হল সংবিধানের ৬৬(২) এর (ঘ) ধারায় যে বিধান দেয়া আছে, আদালত বলেছে সেটা সুপ্রিম ল অব দ্য কান্ট্রি। কাজেই ফৌজদারি কার্যবিধিতে কনভিকশন স্টে করার কোনো বিধান নাই। সাসপেন্ডের বিধান থাক আর না থাক, সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে প্রাধান্য পাবে। সুতরাং অনুচ্ছেদ ৬৬(২) এর (ঘ) অনুযায়ী উনারা নির্বাচন করার যোগ্য নন এবং দণ্ড স্থগিত চাওয়ার কোনো এখতিয়ার রাখেন না। এ কারণে উনাদের দরখাস্ত খারিজ করে দিয়েছে।”
আদালতের এই আদেশের ফলে দুই দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকছে কি না জানতে চাইলে দুদকের আইনজীবী বলেন, “একদম থাকছে না। একথা তো আমি আগেই বলেছি। উনি সম্পূর্ণ খালাস পেলে অথবা দণ্ড বাতিল হয়ে গেছে, তখন উনি পারবেন। আজকের আদেশে এটা আরও স্পষ্ট হল।”

তিনি বলেন, হাইকোর্টের এই আদেশ সবার ওপরই প্রযোজ্য হবে এবং নির্বাচন কমিশনও এর বাইরে কোনো আদেশ দিতে পারবে না।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টে সাজা ও দণ্ড স্থগিতের আবেদন করার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। আদালত বলেছে, দুটি গ্রাউন্ডে এ আবেদন ‘বিবেচনার যোগ্য নয়’। একটি হল, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী সেনটেনস (সাজা) স্থগিত করা যায়, কিন্তু কিনভিকশন (দোষী সাব্যস্ত করা) স্থগিত করা যায় না। দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হল- সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু এর আগেও আমরা ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নজির দেখিয়েছি। যেখানে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এ আদেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করা হবে।”
মামলার বিবরণে জানা যায়, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমানকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত মামলায় ২০০৭ সালের ২১ জুন বিচারিক আদালত ১৩ বছরের সাজা দেন। পরে তিনি আপিল করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন বলে জানান আমিন উদ্দিন মানিক।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, তথ্য গোপন ও দুর্নীতির মাধ্যমে ছয় কোটি ৩৬ লাখ ২৯ হাজার ৩৫৪ টাকার সম্পদ অর্জন করায় ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার রায় দেন। তিনি এ বিষয়ে আপিল করে ২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল জামিন লাভ করেন। এ ছাড়া জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৯৩ লাখ ৩৬৯ টাকার সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপন করার দায়ে আবদুল ওহাবকে যশোর স্পেশাল জজ গত বছরের ৩০ অক্টোবর আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেন। ওহাব এ বিষয়ে আপিল করেন ৬ ডিসেম্বর জামিন পান।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত প্রায় ১০ কোটি পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার ৩০০ টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগে ২০০৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় কুষ্টিয়ার তৎকালীন সহকারী পরিচালক মোশরাফ হোসেন মৃধা মামলা করেন।
এ মামলায় ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুণ্ডু) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মশিউর রহমানকে পৃথক ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১০ কোটি পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩০ টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পরে তিনি আপিল করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন। এ ছাড়া ২০০৮ সালের ২৫ মে দুর্নীতির মামলায় মশিউর রহমানকে ১৩ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন বিচারিক আদালত। এর বিরুদ্ধে আপিল করে হাইকোর্ট থেকে পরে তিনি জামিন নেন।
দণ্ড স্থগিত চেয়ে আবেদন করা বিএনপির পাঁচ নেতা হলেন- সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের নেতা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ঝিনাইদহ-২ এর সাবেক সংসদ সদস্য ও ঝিনাইদহ বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মো. মশিউর রহমান এবং ঝিনাইদহ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. আব্দুল ওহাব।
আদালতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমানের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম। ডা.এ জেড এম জাহিদ হোসেনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, আহসানুল করীম ও খায়রুল আলম চৌধুরী। ওয়াদুদ ভুঁইয়া ও আব্দুল ওহাবের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক, ও ব্যারিস্টার একেএম ফখরুল ইসলাম। মশিউর রহমানের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার আমিনুল হক ও ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক। অন্যদিকে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।
পরে ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আসামিদের পক্ষে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারায় দণ্ড স্থগিত চেয়ে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আদালত বলেছেন, যে ধারায় (ফৌজদারী কার্যবিধির ৪২৬ ধারা) আবেদনগুলো করা হয়েছে সে ধারায় সাজা স্থগিতের কোনও বিধান নেই।
রায় ঘোষণাকালে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, যদি এই সাজা স্থগিতও করা হয় তাতে কোনও লাভ হবে না। কেননা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সংবিধানে বাধা রয়েছে। যেহেতু সংবিধানে বাধা আছে সেহেতু অন্য কোনও আইনে সাজা স্থগিত হলেও কোনও লাভ হবে না।
পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আপিল চলাকালে (পেন্ডিং) সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আপিল পেন্ডিং থাকলেও সাজা স্থগিত হয় না এবং নির্বাচন করতে পারবেন না।
খায়রুল আলম চৌধুরী আরও বলেন, সাজা স্থগিত করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বেশ কিছু নজির আমরা আদালতকে দেখিয়েছি। কিন্তু সেই নজিরগুলো যুক্তিযুক্তভাবে আদালত গ্রহণ করেননি বলে আমরা মনে করছি। তাই এই আদেশের বিরুদ্ধে আমরা আপিলে যাবো।
তথ্য গোপন ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৬ কোটি ৩৬ লাখ ২৯ হাজার ৩৫৪ টাকার সম্পদ অর্জন করায় ওয়াদুদ ভুঁইয়াকে মোট ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার রায় দেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত। তিনি এ বিষয়ে আপিল করেন ২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল, ওই বছরেই তিনি জামিন পান।
এছাড়া জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ৯৩ লাখ ৩৬৯ টাকার সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপন করে মো. আবদুল ওহাবকে যশোর স্পেশাল জজ গত বছরের ৩০ অক্টোবর ৮ বছরের সশ্রমকারাদণ্ড ও ত্রিশ হাজার টাকার জরিমানা দিয়েছেন। তিনি এ বিষয়ে আপিল করেন ৬ ডিসেম্বর জামিন নেন।
জ্ঞাত আয় বহির্ভূত প্রায় ১০ কোটি ৫ লাখ ৬৯ হাজার
তিনশ’ টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগে ২০০৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর
দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় কুষ্টিয়ার তৎকালীন সহকারী
পরিচালক মোশরাফ হোসেন মৃধা মামলা করেন। এ মামলায় ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর
ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুন্ডু) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মশিউর রহমানকে পৃথক ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
দেন আদালত। একইসঙ্গে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১০ কোটি ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩০
টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন আদালত। পরবর্তীতে তিনি আপিল করে
হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন।
এ ছাড়া আমান উল্লাহ আমানকে দুর্নীতির
মামলায় ২০০৭ সালের ২১ জুন বিচারিক আদালত ১৩ বছরের সাজ দেন। পরে তিনি আপিল
করে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন বলে জানান আমিন উদ্দিন মানিক।