**দুর্নীতি প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা**
ইসলামে বিশ্বাসীরা কখনও নৈতিকতা ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে দুর্নীতি করেন না। তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় এবং পরকাল বা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস আমাদেরকে সর্বদা দুর্নীতিসহ সকল প্রকার অপরাধ থেকে দূরে রাখে। কারণ, দুনিয়াতে দুর্নীতির শাস্তি পাওয়া নাও যেতে পারে, কিন্তু আখেরাতে অবশ্যই সকল অপরাধের বিচার হবে। দুনিয়াতে হয়তো মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু আখেরাতে আল্লাহর দরবারে ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নেই। সেদিন আল্লাহ তাআলা বলবেন, “আজ আমি তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছি। তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কর্মের সাক্ষ্য দেবে।” (সুরা-৩৬ ইয়াসিন, আয়াত: ৬৫)
“যদি কোনো সমাজের মানুষ বিশ্বাস করত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশ-পৃথিবীর সকল বরকতের দরজা খুলে দিতাম।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৯৬)
ইসলামে দুর্নীতিসহ সকল অপরাধ দমনের মূল হলো হালাল ও হারাম, বৈধ ও অবৈধ, পবিত্র ও অপবিত্রতার মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা। কোরআন কারিমে বলা হয়েছে, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায্যভাবে আত্মসাৎ করো না। শুধুমাত্র পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ ব্যবসা করা তোমাদের জন্য অনুমোদিত। আর তোমরা কাউকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে অন্যায্যভাবে হত্যা করবে, তাকে আমি দগ্ধ করে ফেলব। এটি আল্লাহর পক্ষে সহজ।” (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯-৩০)
“হে মানুষ! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ কর এবং শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করো না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)
দুর্নীতি মোকাবেলায় রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদে অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিযুক্ত করা জরুরি। পদায়ন ও পদোন্নতি মেধা, সততা এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কথা স্মরণ করুন যিনি মিসরের রাজাকে বলেছিলেন, “আমাকে খাদ্যভাণ্ডারের দায়িত্ব দিন, কারণ আমি নিশ্চয়ই রক্ষণাবেক্ষণকারী ও জ্ঞানী।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫) অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতি দুর্নীতির অন্যতম কারণ।
ন্যায়বিচার ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতি প্রতিরোধের অপরিহার্য শর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় অবস্থানে থাকো, ন্যায্যতার সাক্ষী হিসেবে, এবং কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়পরায়ণতা থেকে বিচ্যুত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটি তাকওয়ার নিকটবর্তী। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা সম্পূর্ণভাবে অবহিত।” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৮)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তুমি কি আল্লাহ-নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি স্থগিত করার জন্য বলছ?” এরপর তিনি একটি খুতবা দিয়ে বলেন, “আগের জাতিগুলো এটাই করে ধ্বংস হয়ে গেছে। যখন তাদের কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তি চুরি করত, তখন তারা তাকে শাস্তি ছাড়াই ছেড়ে দিত। অথচ যখন কোনো দরিদ্র বা সাধারণ মানুষ চুরি করত, তখন তাকে শাস্তি দিত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মদ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত অবশ্যই কেটে দিতাম।” (বুখারি: ৪২৬৩)
ইসলাম সকল নাগরিককে সামাজিক দায়িত্ব দিয়েছে। সুতরাং আমাদের সকলকে দুর্নীতি ও অপরাধ দমনে সচেতন হতে হবে এবং সামাজিক ও নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত, যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য আবির্ভূত করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে অন্যায় দেখবে, সে যেন তা তার হাত দিয়ে নিষেধ করে। আর যদি হাত দিয়ে নিষেধ করতে না পারে, তবে সে যেন মুখ দিয়ে নিষেধ করে। আর যদি মুখ দিয়ে নিষেধ করতে না পারে, তবে সে যেন অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে। আর এটিই হলো দুর্বল ঈমানের লক্ষণ।” (মুসলিম)
● মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com