**রাষ্ট্র সংস্কারে নারীদের অবহেলা কেন?**
ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানে অধিক সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণকে নারীদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়। অভ্যুত্থানের পরে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার বিষয়টিকে রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করতে কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে লিখেছেন ফারহানা হাফিজ, শাম্মিন সুলতানা, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এবং সাবিনা পারভীন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু করে বৈষম্য এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পরিণত হয়। সরকার পতনের দাবি নিয়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষ, বিভিন্ন লিঙ্গপরিচয়ের মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিভিন্ন জাতি-ধর্ম পরিচয়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে নারীদের ব্যাপক সাহসী উপস্থিতি এই আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দেশকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর জন্য রাষ্ট্র সংস্কার সবচেয়ে জরুরি বিষয় হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু ৫ আগস্টের পরে রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও আলোচনা থেকে নারীদের এবং আন্দোলনের নারী সমন্বয়কদের পর্যায়ক্রমে অপসারিত হতে দেখা যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা কি রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্ত ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রায় ৫১ শতাংশ নারীর অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে পারবে? পারবে কি নারীর অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে সংস্কারের দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে?
রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সংবিধান সংস্কার নিয়ে। সংবিধান সংস্কার কমিশনও গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ—যেমন ১৯ (১), ১৯ (৩), ২৮ (১) এবং ২৮ (২)—এ সর্বজনীন নীতির অধীনে নারীর সমতা এবং সব ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু জটিলতা হলো, সংবিধান যেমন রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে নারীর সমান অবস্থানের কথা বলে, তেমনি পারিবারিক আইনের সঙ্গে শরিয়াহ বা ধর্মীয় আইনকেও স্বীকৃতি দেয়। এটি নারীদের জন্য অসম এবং ধর্মভেদে ভিন্ন।
যেমন, মুসলিম নারীর জীবনের চারটি বিশেষ দিক—বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত এবং উত্তরাধিকার পারিবারিক আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখানে নারীরা পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করতে পারে না। আবার এক ধর্মের সঙ্গে আর এক ধর্মের ভিন্নতা রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠে, পারিবারিক আইনের এই বৈষম্যমূলক বিধান কি সংবিধানের ২৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্র শুধুমাত্র ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না’—এর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক নয়?
বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালে বৈশ্বিক সনদ ‘নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্য দূরীকরণ (সিডও)’ অনুমোদন করলেও এখনো এর ২ এবং ১৬.১ (গ) ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখেছে। সিডও-র ধারা ২ রাষ্ট্রকে লিঙ্গভিত্তিক অসমতা তৈরি করে এমন যেকোনো আইন, নীতি, বিধান, প্রথা, অভ্যাস পরিবর্তন এবং বাতিল করতে সংবিধানসহ প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কারভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের এবং ধারা ১৬.১ (গ) বিয়ে এবং বিবাহবিচ্ছেদে সমান অধিকারের কথা বলে। শরিয়াহ আইনের সঙ্গে বিরোধ স্থাপন করে এমন কোনো বিধান করা যাবে না এই যুক্তিতে সিডও সনদের সংরক্ষণ এখনো তুলে নেওয়া হয়নি। তুরস্ক, ইয়েমেন, জর্ডান, লেবানন, তিউনিসিয়া, কুয়েতসহ বেশ কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সিডও অনুমোদন করেছে।
এছাড়া দেশের সব ধর্মের সব নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন (ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড) প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে নারী আন্দোলন। বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়নের দাবি নিয়ে বিগত সরকার একটি খসড়া আইন তৈরি করে। কিন্তু তাতে নানা অসংগতি থাকায় তা পরে থেমে যায়।
সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র সব নাগরিকের সমান গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ। সংবিধান সংস্কারের এজেন্ডায় নারীর সমানাধিকার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে পারিবারিক আইনে বৈষম্য সৃষ্টিকারী সব বিধান বাতিলের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এ ছাড়া সিডও সনদ থেকে সব সংরক্ষণ তুলে নেওয়াও জরুরি।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, জেন্ডার সমতা অর্জনের পথে বাংলাদ