মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তাবাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযান চলাকালে মুসলমান রোহিঙ্গা কিশোরী ও নারীদের ধর্ষণের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা চালিয়েছে সে দেশের সরকারি বাহিনী।
এ ঘটনায় জরুরিভিত্তিতে একটি স্বাধীন, আন্তর্জাতিক তদন্তের অনুমোদন দিতে মিয়ানারের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের সদস্যরা দলবদ্ধভাবে হামলা চালিয়েছেন। বন্দুকের নলের মুখেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
এইচআরডব্লিউ বলছে, রাখাইনে জাতিগত সংখ্যালঘু ও ধর্মের বিভাজনের কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা হয়েছে বলে নতুন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের বিবরণে উঠে এসেছে।
সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ গবেষক প্রিয়াঙ্কা মোটাপার্থ বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা চালানোর বিষয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ও বিকৃত ইতিহাস রয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো লোমহর্ষক হামলা বর্বরতার নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে। এসব অপরাধ বন্ধ বা জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে সামরিক ও পুলিশ কমান্ডাররা যদি সবটা না করে থাকেন, তবে তাঁদের আইনগতভাবে দায়ী করা উচিত।
মানবাধিকার সংগঠনটি বলছে, নিপীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া ১৮ জন রোহিঙ্গা নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এইচআরডব্লিউ’র গবেষকেরা। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এই নারীদের মধ্যে ১১ জনই রাখাইনে যৌন হামলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১৭ জন নারী ও পুরুষ তাঁদের নিকট পরিজনের যৌন সহিংসতা শিকার হতে দেখেছেন। এই ১৭ জনের মধ্যে আবার যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া কয়েকজন নারী রয়েছেন। সব মিলিয়ে সংগঠনটি ২৮টি ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
এইচআরডব্লিউ বলছে, রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বশেষ সহিংস অভিযানের মুখে ৬৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা এডুকেশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রামের সাধারণ সম্পাদক জমির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে যে নির্যাতনের যে লোমহর্ষক বিবরণ ফুটে উঠেছে, ঘটনার ভয়াবহতা তার চেয়েও বেশি। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
জনাব জমির উদ্দিন বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারি রোহিঙ্গা মুসলমান শরণার্থীদের জন্য জরুরি খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে কফি আনান কমিশনের অন্যতম সদস্য ঘাসান সালামাহ ও উইন ম্রাকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামিক সেন্টার অব মিয়ানমারের প্রধান আহ্বায়ক আই লুইন গত ২৮ থেকে ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তারা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে নতুন করে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে তাদের দুরবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জেনেছেন।
মালয়েশিয়ার ত্রাণবাহী জাহাজ আসছে বাংলাদেশে
এদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য মালয়েশিয়ার একটি ত্রাণবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আসছে।
রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় ২ হাজার ২০০ টন ত্রাণ বহনকারী ‘নটিক্যাল আলিয়া’ নামের জাহাজটি কুয়ালালামপুরের ক্লাং বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। এটি সরাসরি ইয়াঙ্গুনে পৌঁছাতে পারে।
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়নের শিকার হওয়া যেসব রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়েছেছে, তাদের জন্যও ত্রাণ সরবরাহ করতে জাহাজটি এখন ইয়াঙ্গুনের পথে।
মালয়েশিয়ার ত্রাণবাহী জাহাজ নটিক্যাল আলিয়া ১০ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছাবে। এরপর আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে ওই ত্রাণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
পার্সটুডে’র উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা ইকনা সোমবার নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ৯ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মিয়ানমারের মংডু জেলার অন্তত ন’টি গ্রামে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, আগ্রাসীভাবে দেহ তল্লাশি ও যৌন হামলায় অংশ নেয় দেশটির সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের সদস্যরা।