৫২ জাতীয় ডেস্ক।।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি ইউনিক নির্বাচন। সংসদ এবং পূর্ণাঙ্গ বড় আকারের মন্ত্রিসভা রেখে এমন নির্বাচন বাংলাদেশে তো নয়ই উপমহাদেশে হওয়ার নজিরও খুব কম। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।তিনি বলেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে যা বোঝায় তা এখানে ঠিকভাবে করা হচ্ছে না। তাছাড়া বিভিন্ন মামলার রায়, নতুন করে মামলা, গ্রেফতারসহ বিভিন্ন কারণে বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে কোনঠাসা হয়ে আছে।
রেডিও তেহরান: জনাব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল(অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অনেকে বলছেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো তৈরি হয় নি। আপনি কীভাবে দেখছেন?

এম.সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, বাংলাদেশে যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেটি একটি ইউনিক বা অভূতপূর্ব নির্বাচন। কারণ হচ্ছে- বাংলাদেশ তো বটেই উপমহাদেশেও সংসদ ও পূর্ণাঙ্গ বিশাল মন্ত্রিসভা রেখে নির্বাচন হওয়ার নজির খুব কম আছে। বলা চলে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরও কারণ হচ্ছে- ক্ষমতাসীন সরকারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরাও প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তাদের সাথে নির্বাচন করবেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকা সাধারণ রাজনীতিবিদরা। ফলে এই নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং বলতে আন্তর্জাতিকভাবে যেটাকে বোঝানো হয়ে থাকে সেটা ঠিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। একইসাথে বাস্তব চিত্রও সেরকম দেখা যাচ্ছে না। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা বড় ফ্যাক্টর। যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনের প্রার্থীরা সমান লেভেলে না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের একটা বিষয় থেকে যায় আমাদের মতো একটা দেশে। সেটা এড়ানো সম্ভব হয় না।
রেডিও তেহরান: রায়ের মাধ্যম বিএনপিকে নির্বাচনে কোনঠাসা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এম. সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, অভিযোগ তো আছেই। অভিযোগ থাকতেই পারে। যেহেতু বিভিন্ন মামলার বিচার হচ্ছে। দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেলে যাচ্ছেন অনেকে। তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে নানা আঙ্গিকে মামলা হচ্ছে এবং অন্যান্যদের দাবি অনুযায়ী অনেকে গ্রেফতার হচ্ছেন। তাদের পরিচয় আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখছি। এগুলো হচ্ছে। এসবের উপসংহারে বলব কোনঠাসা করা হচ্ছে কী হচ্ছে না এমন নয়; কোনঠাসা হয়ে আছে। আর তা মিডিয়ায় ও পত্র-পত্রিকার প্রতিদিনই বের হচ্ছে।

রেডিও তেহরান: বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের একটা তালিকা দেয়া হয়েছে। আপনার কী মনে হয় নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে নির্বিঘ্নে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে?
এম.সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, আমাদের দেশে বর্তমান সময়সহ সবসময়ই বিরোধীদলসহ অন্যান্যদের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ থাকে। অভিযোগের তালিকা থাকে। এসব অভিযোগের দুটো দিক আছে।
এখন চারপাতার অভিযোগ থাকলে তারমধ্যে এক পাতার অভিযোগ ঠিক হতে পারে। এভাবে দেখা যেতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশনে যখন সুনির্দিষ্ট করে নাম ধরে কোনো অভিযোগ দেয়া হয় এবং অভিযোগের কারণগুলোও উল্লেখ করা হয় তাহলে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে ওইসব বিষয়কে তদন্ত করে দেখা অভিযোগগুলো কতখানি সত্য। যদি অভিযোগ সত্য হয় তাহলে তার প্রতিকার করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের দেয়া আছে। কাজেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে যে অভিযোগের তালিকা দেয়া হয়েছে তারসঙ্গে যদি কারণও ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে তাহলে আমার মনে হয় যে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে আছে বিষয়টিকে খতিয়ে দেয়া। শুধু খতিয়ে দেখা নয় অভিযোগকারীকে জানিয়ে দেয়া তার অভিযোগ কতখানি সত্য আর কতখানি সত্য নয়। তাছাড়া অভিযোগের বিপরীতে কী পাওয়া গেল সেটা যদি জানিয়ে দেয়া হয় তাহলে একটা স্বচ্ছতার জায়গা থাকবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের নির্বাচন কমিশনের কাছে এমন কোনো স্থায়ী ম্যানুয়াল নেই-যেখানে অভিযোগের ধরন কী হবে, কীভাবে হবে, কারা করতে পারবে, কী বিচার হবে, কীভাবে নিষ্পত্তি হবে? অথচ এরকম একটা ম্যানুয়াল থাকা খুবই জরুরি বলে মনে করি।
রেডিও তেহরান: নির্বাচনের আগে যেসব আচরণবিধি মেনে চলার কথা তা নিয়েও নানা কথা রয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- আগে থেকে লাগানো পোস্টার ও ব্যানার সরানো হয় নি। বিষয়টি কিন্তু নির্বাচনের কমিশনের দেখভাল করার কথা। আপনার মন্তব্য কী?

এম. সাখাওয়াত হোসেন: হ্যাঁ, নির্বাচন কমিশনকে এসব বিষয়কে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া উচিত। কারণ এইসব ছোটো ছোটো বিষয়গুলো পরবর্তীতে খুব আকার ধারন করে। নির্বাচন কমিশন যদি শুরু থেকে শক্তহাতে অনিয়মগুলো নিবারণ না করে তাহলে পরবর্তীতে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।
পোস্টার লাগানো আছে; আছে ব্যানার। এটা খুব একটা বড় জিনিষ নয় আচরণবিধির মধ্যে থাকা বড় ধরনের বিষয়গুলোর যে লঙ্ঘন হচ্ছে সেগুলো এই মুহূর্তে বন্ধ করা। এরপর যখন ক্যাম্পেইন শুরু হবে তখন আচরণবিধি ভঙ্গের যেসব ঘটনা ঘটতে পারে সে সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। যতটুকু জানি নির্বাচন কমিশন অলরেডি ম্যাজিষ্ট্রেট মোতায়েন করেছে। তারা কী কাজ করছে সেটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
রেডিও তেহরান: নির্বাচন কমিশন সচিব সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের ব্রিফ করেছেন; সেখানে তিনি বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে কোনো ঝামেলা হলেও পর্যবেক্ষকরা কোনো মন্তব্য করতে পারেবন না তারা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন। তো যদি শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে হয় মূর্তির মতো তাহলে তারা কী দায়িত্ব পালন করবে? কমিশন সচিবের এই বক্তব্য সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?

এম. জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, কমিশন সচিবের বক্তব্য নিয়ে আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন তার সাথে একমত। নির্বাচন কমিশন সচিবের ব্রিফিংয়ের সাথে আমি নিজেও একমত নই। দেশি এবং বিদেশি দু ধরনের পর্যবেক্ষক থাকেন। আর পর্যবেক্ষক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দেশীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য বিশেষ কিছু বিধি আছে। সেই বিধিতে বলা আছে পর্যবেক্ষক কী কী করতে পারবেন। মোবাইল পর্যবেক্ষক কিছুক্ষণের জন্য ভেতরে বসতে পারবেন। ভেতরে দেখতে পারবেন এমনকি তিনি গণনার সময় হাজির থাকতে চাইলে থাকতে পারবেন। ছবি তোলা না তোলার ব্যাপারে কিছু বলা নেই। তবে ছবি না তুললে তিনি রিপোর্ট কিভাবে করবেন? এটাও বলা আছে কোনো ধরনের ব্যত্যয় দেখলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে পারবেন। তবে নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক কোনো মন্তব্য তিনি মিডিয়ার কাছে করবেন না। কিছু বলতে হলে তিনি নির্বাচন কমিশনকে অভিযোগের বিষয়টি জানাবেন পরবর্তী পর্যায়ে তারা রিপোর্ট দিতে পারেন।
আমি আপনার সাথে একমত-নির্বাচন কমিশন সচিবের পক্ষ থেকে যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে বা যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে যদি কোনো কিছু হয় তাহলে পর্যবেক্ষণের কোনো মানে থাকে না। পর্যবেক্ষক যদি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে সেই পর্যবেক্ষণের কোনো উপকারিতা নির্বাচন কমিশনে আসবে না। আমি জানিনা নির্বাচন কমিশন সচিবের ওই বক্তব্যকে দেশীয় পর্যবেক্ষকরা কিভাবে নেবেন!
রেডিও তেহরান: সবশেষে -সাবেক নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আপনার কাছে জানতে চাইব- আপনার অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বাস্তবতায়-আগামী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ হবে বলে মনে করছেন।

এম. সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, আশা তো আমাদের করতেই হবে। এখনও নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। যখন পুরোপুরি প্রক্রিয়া শুরু হবে তখন মূল্যায়ন করে বলা যাবে আমরা কতখানি আশা করতে পারি।
আর আমরা আশাবাদি হতে চাই এইজন্য যে, বারবার দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পাবিলিকলি বলছেন তিনি একটি সুস্থ নির্বাচন চান। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ধরেই যদি আমরা আশা রাখতে চাই। শুধু প্রধানমন্ত্রীই নয় দেশের সমস্ত মানুষ ও ভোটারগণ চায় দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। আর তার মাধ্যমেই সরকার গঠিত হবে। আর সেটাই গণতন্ত্রের নীতি। যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাশার কোনো বড় ধরনের ব্যত্যয় দেখছি না তত্ক্ষণ আমরা আশা করতে পারি। তবে নানাধরনের মামলা, গ্রেফতার, বিচার, জেল হচ্ছে।এটা যদি নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলে এবং সরকারি কর্মকর্তা কমচারী তাদের আচরণ ও মনোভাবের পর্যবেক্ষণে যদি নেতিবাচক কিছু দেখা যায় তাহলে মানুষ সেই আশার জায়গা থেকে সরে আসবে।