**স্বাধীনতার দিবস ও জাতীয় ইতিহাস নিয়ে সরকারের ফ্যাসীবাদী বক্তব্য**
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কবি আবুল হাসান লিখেছিলেন, সবই রাজনীতি, নির্মাণ থেকে ধ্বংস, এমনকি প্রকৃতির পরিবর্তনও। এই বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের এখনও লড়াই করতে হচ্ছে। যেকোনো সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের নীতি-নির্দেশনাও বদলে যায়। কিন্তু সেই পরিবর্তনগুলো যতটা জনগণের কল্যাণের জন্য, তার থেকে বেশি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য হয়।
জাতীয় দিবস পালনের উদ্দেশ্য কি? জাতীয় চেতনা এবং জনগণের আবেগ-অনুভূতি জাগ্রত করার চেষ্টা। যেমন স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, জাতীয় শহীদ দিবস, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং বাংলা নববর্ষ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের বদলে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে আন্দোলনের মুখে সরকার আপসের রাস্তায় এসে দুটিই পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এখন আবারও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস হিসেবেই পালিত হচ্ছে।
ইদানীংকার সরকার ঐতিহাসিক ৭ মার্চসহ আটটি জাতীয় দিবস পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এর আগে প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজেও এসব দিবস বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।
গত সরকারের মতোই বর্তমান সরকারও জাতীয় দিবসগুলোকে দলীয়তার রঙে রাঙিয়ে ফেলেছে। এটি অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে যে আটটি দিবসের সবগুলোই একই পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না। যেমন ৭ মার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।
সরকার যেসব দিবস জাতীয় দিবসের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে তার মধ্যে আছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস, ৫ আগস্ট শহীদ ক্যাপ্টেন শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী, ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, ১৮ অক্টোবর শেখ রাসেল দিবস, ৪ নভেম্বর জাতীয় সংবিধান দিবস এবং ১২ ডিসেম্বর স্মার্ট বাংলাদেশ দিবস।
৭ মার্চ এমনই একটি দিন, যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”। সেই দিনই তিনি বলেছিলেন, “আর দাবায়ে রাখতে পারবা না”, যা সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দেয়ালে লিখিত হওয়া স্লোগানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। মানে, ৭ মার্চের ভাষণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মন্ত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। সেই ৭ মার্চকে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
আগের সরকারের মতো এই সরকারও ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন না করার এবং ছুটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত আদেশ সাপেক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, উচ্চ আদালত যদি ভবিষ্যতে ভিন্ন আদেশ দেয়, তাহলে কি আবার ১৫ আগস্ট জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হবে? জাতীয় জীবনে এমন কিছু বিষয় আছে, যা আদালতের নির্দেশ দ্বারা হওয়া উচিত নয়। এই ধরনের বিষয়ে রাজনৈতিক এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও আমরা সেটা করতে পারিনি। প্রতিটি সরকারই জাতীয় গর্বকে তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
এর উদাহরণ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কথা বলা যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা আদালতের একটি বিতর্কিত রায়ে বাতিল হয়ে যায়। বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক সংকট রয়েছে, তার মূলে রয়েছে সেই রায় এবং সংসদে আওয়ামী লীগের একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার সিদ্ধান্ত।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার অনেক বছর ধরে ৪ নভেম্বরের সংবিধান দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং এটা বলা যায়, দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞরা আন্দোলন করে এই দাবি আদায় করেছেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে সমকাল পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছিলেন, “সংবিধান দিবসের স্বীকৃতি দিতে হবে এবং একে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্ব সহকারে পালন করতে হবে।” ১৯৯৯ সালে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির ৩৪ জন সদস্যদের মধ্যে ১৯ জনকে সম্মান জানিয়ে তারা একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, “সব সরকারই মুখে আইনের শাসনের কথা বলে, কিন্তু আইনের শাসন প্রতি