৫২ জাতীয় ডেস্ক।।
বিএনপির নির্বাচিত এমপিদের শপথ নেয়া খুবই ভালো হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে তারেক জিয়া ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। আর অন্যরা শপথ নিলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ না নেয়াটা ভালো কাজ হয়নি।
গণমাধ্যমকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন, বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিকিৎসক, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
প্রশ্ন: জনাব ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আপনার কাছে প্রথমে জানতে চাইব, বাংলাদেশে বিএনপি’র এমপিদের শপথ নেয়া নিয়ে নানা নাটকীয়তা হয়েছে। চূড়ান্তভাবে দলের মহাসচিব বাদে সবাই শপথ নিয়েছেন। কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিষয়টিকে?
ডা. জাফরুল্লাহ: দেখুন, বিএনপি থেকে নির্বাচিত হয়ে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারা ভালো কাজ করেছেন। আমি দীর্ঘদিন ধরে একটি কথা বলছিলাম সেটি হচ্ছে আন্দোলন হবে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে। আর সেজন্য নির্বাচিতদের সংসদের ভেতরে যাওয়া উচিত এবং তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং সংসদে যাবেন। এটা খুবই ভালো কাজ হয়েছে।
তবে তারেক জিয়া এ বিষয়ে ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। এ ব্যাপারে পুরোপুরি সুনামের ভাগীদার তিনি হতে পারলেন না। তারেক জিয়া পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন। তারেক জিয়ার উচিত ছিল এ বিষয়ে ভালো মন্দ সব বিষয়ে আগে থেকে স্ট্যান্ডিং কমিটির সাথে আলাপ আলোচনা করা। তবে সংসদে না যাওয়ার কোনো অবকাশই ছিল না আমার মতে।
আমার মতে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত চতুরতার সাথে আমলাদের মাধ্যমে ভোট করিয়েছেন ২৯ ডিসেম্বর রাতে। যেটি আমাদের কারও প্রত্যাশিত ছিল না। তারপরও আমার মতে যেভাবেই হোক সংসদে ৫ জন সার্ভাইভ করেছেন। এটি খুবই ভালো। তারা সংসদে যাচ্ছেন এটাকে আমি সমর্থন করি।
প্রশ্ন: ড.জাফরুল্লাহ আপনি যে কথাটি বললেন বিএনপির এমপিদের শপথ নেয়ায় ভালো হয়েছে। তবে ঘটনায় পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম কথাবার্তা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন- দিকভ্রান্ত বিএনপি। আপনিও বলছেন এতে দুর্ভাগ্যও রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ডা. জাফরুল্লাহ: দেখুন, আমি যে দুর্ভাগ্যের কথা বলছি সেটি হচ্ছে তারেক জিয়া স্ট্যান্ডিং কমিটিকে তার আস্থায় নিলেন না। তাদের সাথে কোনো কথা বললেন না। তার এই পদ্ধতিটা কোনোমতেই ভালো হলো না। তিনি এ বিষয়ে একটি ভুল পথে গেলেন। এরফলে নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্ম নিল।
আমি গত ১৮ এপ্রিল থেকে চেষ্টা করেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটা সংলাপের। আমি এ ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন সাহেবকে বলেছিলাম। অন্যান্য অনেককে বলেছি কিন্তু তারা আমার কথা গ্রহণ করেন নি। যদি আমরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপ করতে পারতাম তাতে হয়তো খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ত্বরান্বিত হতো। আরো যে ৫০ হাজার লোক জেলে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে অকারণে গায়েবি, আজগুবি, মিথ্যা মামলা রয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহার হতে পারত। হয়তো তাদের হয়রানিটা কম হতো।
তারপর প্রধানমন্ত্রীকে একটা চাপ দেয়া যেত। বলা যেত আপনি তো খারাপ নির্বাচন করেছেন। সেকারণে এবার একটা অন্তর্ববর্তী নির্বাচন দিন। অন্যদিকে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রণ্টের পক্ষ থেকে আমরা বলতে পারতাম আমরা আগামী বছর সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে চাই। আর এটি আওয়ামী লীগের জন্য একটি বড় জয় হতো। আর বিএনপির জন্য লাভ হতো তারা যদি খালেদা জিয়াকে বের করে আনতে পারত। অন্ততপক্ষে অন্তর্বর্তী নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা করতে পারত। এসব বিষয়কে তাদের এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু এসব কোনো কিছুই না করে ওনারা বসে বসে ঘুমালেন। শেষ মুহূর্তে এসে শপথ নিলেন। তারপরও বলব এটি মন্দের ভালো। ভালো কাজ করেছেন।
তবে এখানে ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ না নেয়াটা ভালো কাজ হয় নি। তারেক রহমানের উচিত ছিল ফখরুলকে এবং স্ট্যান্ডিং কমিটিকে আস্থায় নিয়ে এবং রাজী করিয়ে সংসদে পাঠানো। তাহলে হয়তো সংসদ শক্তিশালী হতে পারত। তারা হয়তো সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারতেন। এসব জায়গায় তারা ঝড় উঠাতে পারতেন। এক সময় সংসদে গিয়ে এক সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আওয়ামী লীগের জন্য অনেক কিছু করেছিলেন। আমি বলব বিএনপির দুর্ভাগ্য হচ্ছে তারা যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করছেন না। তারা এসব বিষয় নিয়ে হোমওয়ার্ক করছেন না। তারা অনেক বেশি ঘুমাচ্ছেন। তাদের জন্য এটা যুদ্ধ ক্ষেত্র। ফলে চব্বিশ ঘন্টা তাদের কাজ করা উচিত। বিএনপির নেতারা বাইরে গিয়ে মিটিং সমাবেশ করছে এমনটি দেখতে পাই না। সরকার বাধা দেয়, আপত্তি জানায় একথা সত্য। বিষয়টি আমি জানি তারপরও নেতাদের যথেস্ট চেষ্টা নেই বলে আমি মনে করি। আর এটাই হচ্ছে দুর্ভাগ্য।
প্রশ্ন: ডা. জাফরুল্লাহ- আপনার কি মনে হয়েছে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ভুল করেছে?
ড. জাফরুল্লাহ: দেখুন, কতগুলো বিষয় আমি সরাসরি করার পক্ষপাতি। যেমন ধরুন সরকারের ক্ষমতাটা মূলত প্রধানমন্ত্রীর হাতে। ফলে আলোচনা করতে হলে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। অন্য কোনো মন্ত্রী বা অন্য কারো সাথে কথা বললে তো হবে না। বাকিরা সবাই প্রধানমন্ত্রী কী বলেন সেদিকে তাকিয়ে বসে থাকেন। ফলে আমার মতে বিএনপির প্রথম ভুল হচ্ছে তারা একবারও দাবি করে নি যে তারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ-আলোচনা করতে চায়।
ড.কামাল হোসেনকে সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলে তাদের অনেক বেশি লাভ হতো। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তা আছে। এটি ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করে। সরকারের এবং দেশে বিদেশে অনেকেরই ড. কামাল হোসেনের ওপর বিশেষ আস্থা আছে। তিনি আইনের মানুষ, ভদ্রলোক মানুষ তাকে পর্যাপ্ত ব্যবহার করা হচ্ছে না। তাছাড়া বিএনপি স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং করেছে অথচ নির্বাহী কমিটিকে তারা ডাকেন নি। উপদেষ্টামন্ডলীদেরকে এবং ভাইস প্রেসিডেন্টদের ডাকেন নি। ফলে তারা এসব ভুল করেছে। অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন সাহেব, আসিফ নজরুল এবং শাহদীন মালিকের পরামর্শ নেয়া উচিত ছিল। তাদের পরিধিটা বাড়ানো উচিত ছিল। তারা কেবল নিজে, নিজের বউ, মেয়ে এভাবে পরিবারের মধ্যে সবকিছু রাখার চেষ্টা করেছে। এই পরিবারতন্ত্র প্রবৃত্তি বাদ দেয়া উচিত।
প্রশ্ন: আপনি পরিবার তন্ত্রের বিরোধীতা করছেন। বিশেষ করে সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যরা যোগ দেয়ার পর তাদের কোটায় একজন নারী সংসদ সদস্য আছে। সেখানে গণমাধ্যমের খবরে দেখলাম জিয়া পরিবারের দু একজনের নামও রয়েছে। তাছাড়া আরও সদস্য নারী এমপি পদের প্রত্যাশী রয়েছেন। তো এ বিষয়ে কী বলবেন আপনি?
ড. জাফরুল্লাহ: দেখুন, এখন বিএনপির কোটায় সংরক্ষিত আসনে একজন নারী সংসদ সদস্য নিতে পারবে। এটাও তারা সবার মধ্যে আলাপ আলোচনা করে ভালো, যোগ্য, শিক্ষিত, জ্ঞানী এবং যৌক্তিকভাবে কথা বলতে পারেন এমন একজনকে ঠিক করতে পারেন। আমার মতে নারী সদস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখেন এমন যে কয়জন মহিলা আছেন তারমধ্যে ড. পাপিয়া, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, আফরোজা, শ্যামা ওবায়েদ, দিলারা চৌধুরী আছেন। তবে তাদের মধ্যে সবদিক বিবেচনায় রুমিন ফারহানা হচ্ছেন যোগ্য। তার শিক্ষা, কথাবার্তা, চিন্তা চেতনা সবই যথাযথ। তাছাড়া রাজনীতি নিয়ে তিনি ব্যাপক হোমওয়ার্ক করেন।ফলে তাকে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।