জাতীয় সংবাদপত্রের তুলনায় আঞ্চলিক বা স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার প্রচার-প্রসার, বস্তুনিষ্ঠ পেশাগত চর্চা ও তার প্রকাশনায় গতিশীলতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করার জন্যেই অপরিহার্য। যে কোন ধরণের ধারণার চর্চা করতে হয় তৃণমূল থেকে। মফস্বলে অবস্থান করছে আমাদের তৃণমূল সমাজ।
সংবাদপত্রকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ’চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা ও তার সমাধান কি হতে পারে এ সব কিছুই উঠে আসে স্থানীয় সংবাদপত্রে। মূলত স্থানীয় সংবাদপত্র শাসক গোষ্ঠী ও জনগণের মাঝে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
আঞ্চলিক সকল সমস্যা একমাত্র স্থানীয় সংবাদপত্রই প্রকাশ করতে পারে। সংবাদপত্রকে মনে করা হয় জনগণের সদাজাগ্রত লোকসভা বলে। স্থানীয় সংবাদপত্র পারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে।
কিন্তু স্থানীয় সংবাদপত্রের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় পত্রিকার ডিক্লারেশন সমস্যা, আর্থিক দৈন্যতা, বিজ্ঞাপন প্রাপ্তিতে সমস্যা, প্রশাসনের অসহযোগিতা, দক্ষ সংবাদকর্মীর অভাব, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে বাধা, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের চাপ, ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে পত্রিকা প্রকাশ করা ইত্যাদি। সরকার ও সচেতন মহল স্থানীয় সংবাদপত্র প্রকাশে যথাযথ সহযোগীতার হাত বাড়ালেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
জাতীয় পত্রিকাসমূহে স্থানীয় সংবাদ কম আসে বলে স্থানীয় জনসাধারণের দুঃখ দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরার জন্যে স্থানীয় পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। কিন্তু মতামত জরিপে জানা যায় যে, মূলত আর্থিক দৈন্যতার কারণেই আঞ্চলিক বা স্থানীয় পর্যায়ের সংবাদপত্রগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হয় না। সরকারি বেসরকারি বিজ্ঞাপন না পাওয়ার কারণে স্থানীয় অনেক পত্রিকাই বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়েকটি পত্রিকা এখনো টিকে আছে সেগুলোর অধিকাংশই সম্পাদকদের নিজ পকেটের টাকায় ছাপা হয়।
অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সংবাদকর্মীদের কোন সম্মানি দিতে পারে না, ফলে সংবাদকর্মীরা এ পেশা ছেড়ে দিয়ে বিকল্প পেশায় চলে যায়। অবশ্য যথাযথ সম্মানি ছাড়া যে কোন কাজকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করাও ঠিক নয়। তাই জীবনের তাগিদে তারা অন্য পেশায় যুক্ত হয়। এতে করে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো প্রশিক্ষিত সংবাদকর্মী পায় না। পত্রিকা প্রকাশের জন্য অর্থনৈতিক যোগান অবশ্যই দরকার, সেজন্যে ডিএফপি’র কেন্দ্রীয়ভাবে বিজ্ঞাপন বণ্টন না করে স্থানীয়ভাবে বিজ্ঞাপন দেয়া উচিত।
পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রয়োজন আর্থিক সঙ্গতি। আর এ আর্থিক স্বচ্ছলতার একটি উপায় সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকার জন্যে প্রচলিত বিজ্ঞাপন নীতি খুবই বৈষম্যমূলক। বেসরকারি বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ শিল্প কারখানা না থাকার কারণে বেসরকারি অবস্থান থেকেও তেমন কোন বিজ্ঞাপন প্ওায়া যায় না।
বেসরকারি ভাবে যাদের দু’একটি কলকারখানা আছে তারা মনে করে স্থানীয় পত্রিকার পাঠক কম। কম মানুষই স্থানীয় সংবাদপত্র পড়ে। তাই স্থানীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিলে তাদের প্রচার-প্রসার কম হবে ভেবে তারা জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রদানকে তারা অযথা খরচ বলে মনে করেন।
সরকারি পর্যায় থেকে স্থানীয় পত্রিকাগুলো যে ছিঁটেফোটা বিজ্ঞাপন পায় তাতে তেমন একটা উপকার হয় না। সরকারি দ’ুএকটি বিজ্ঞাপন পাওয়া গেলেও বিজ্ঞাপনের বিল প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় পত্রিকাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হলে স্থানীয় বিজ্ঞাপনগুলো স্থানীয় পত্রিকায় দেওয়া উচিত। স্থানীয় পত্রিকার সাথে যেহেতু আম জনতার জীবন জীবিকার যোগসূত্র থাকে, তাই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানটির সাথে জনতার মিলন অটুট রাখার জন্যে স্থানীয় সংবাদপত্রও অত্যাবশ্যক।
সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সাংবাদিকতার রয়েছে বিশাল ভূমিকা। এমন অনেক ঘটনাই আছে যেগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশের পর জনগণ তার প্রতিকার পেয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনমূলক সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সাধারণ মহল এ বিষয়ে প্রতিকার পেয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষও তাদের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সংবাদের রয়েছে শক্তিশালী অবদান।
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের অভাবে স্থানীয় সংবাদপত্র – পত্রিকায় কর্মরত সংবাদকর্মীদের মধ্যে জনগণ, সংবাদপত্র ও প্রশাসনের সাথে সম্পর্কের প্রকৃতি কেমন হ্ওয়া উচিত সে সম্পর্কিত ধারণার অভাব রয়েছে। সেই সাথে সমাজের সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতার অভাবে সংবাদপত্রগুলো স্থানীয় জনতার দুঃখ দুর্দশা ও চাওয়া পাওয়ার মুখপাত্র হয়ে উঠছে না। জনগণও সে কারণে স্থানীয় সংবাদপত্রের মুখাপেক্ষী হয়ে উঠছে না।
জাতীয় পত্রিকা সমূহে গ্রামের পাঠক, স্থানীয় সংবাদ সম্পর্কে জানতে চাইলে জানতে পারে কম। কেননা জাতীয় পত্রিকাগুলোতে মফস্বলের জন্যে মাত্র দু’একটি পাতা বরাদ্দ থাকে। তাতে ৬৮ হাজার গ্রামের ছবি ভেসে উঠে না। অথচ গ্রাম নিয়ে বাংলাদেশ। কিছু জাতীয় পত্রিকায় গ্রামের জন্যে বা স্থানীয় খবরের জন্যে জায়গা খুব কম। আবার, গ্রামের পাঠক যেমন শহরের সংবাদ অন্বেষণ করে তেমনি শহরের পাঠকও গ্রামের সংবাদের খোঁজে থাকে। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের যথাযথ উপায় না থাকায় দ’ুশ্রেণির পাঠই হতাশ হন।
স্থানীয় পত্রিকার গুণগত মান ও বৈশিষ্ট্য ঠিক করা সম্ভব হলে, স্বল্প পাঠক সমস্যা যেমন দূর হবে তেমনি পাঠককেও গ্রামের খবর শহরের খবর খুঁজতে হবে না। মানসম্মত পত্রিকা প্রকাশ হলেই মানুষের কেন্দ্রানুগ মানষিকতা লোপ পাবে। এ ব্যাপারে সম্পাদক ও সংবাদকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা পত্রিকার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য স্থির করে স্থানীয় সমস্যা ও সমাধানের প্রতিবেদন উপস্থাপনসহ প্রশাসনিক যাবতীয় সহযোগিতা প্রদান করা দরকার। এ ছাড়া ডিএফপি’র বৈষম্যমূলক বিজ্ঞাপননীতি বদল করা যেতে পারে। স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্যে বিজ্ঞাপনদাতাদের উৎসাহিত করা দরকার।
পরিশেষে উল্লেখ করতে চাই যে, প্রেসক্লাব হচ্ছে সাংবাদিক ও সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত পেশাজীবীদের সংগঠন। বর্তমান ও প্রাক্তন সাংবাদিক ও সংবাদ সংগ্রহে নিয়োজিত পেশাজীবী, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, গণযোগাযোগ পেশাজীবীরাই প্রেসক্লাব এর সদস্য হয়ে থাকেন। প্রেসক্লাবগুলো এর সদস্যদের শুধু মিলিত হয়ে আড্ডা দেয়ার জায়গা নয়। এখানে পেশাগত উন্নয়নে কিছু কার্যক্রমও ন্ওেয়া উচিত। এখানে, সংবাদপত্র ্ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের বক্তৃতামালা, সেমিনার, সম্মেলন, শিল্প ও সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে করে আঞ্চলিক বা স্থানীয় পর্যায়ের প্রেসক্লাবগুলোতে সাংবাদিকদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধন হবে।
২৮ মে ২০১৫ তারিখে গাজীপুর সদর উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এই প্রেসক্লাবের প্রথম বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হচ্ছে। গাজীপুর সদর উপজেলা প্রেসক্লাব এর প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে এর প্রকৃত কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং তার উত্তরোত্তর উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করি।