কুমিল্লায় যুদ্ধ হয়নি, তবু কেমনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধি তৈরি হলো?
কুমিল্লার ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি (যুদ্ধস্মৃতি) এখন একটা ঐতিহাসিক স্থান। সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে ছায়ামাখা এই স্থানে ঘুমিয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ১৩টি দেশের ৭৩৭ জন সৈনিক।
এই স্থান কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পশ্চিম পাশে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায়। প্রতিদিনই অনেক দর্শনার্থী এখানে আসেন। বিদেশিদেরও আনাগোনা আছে।
কুমিল্লায় তো যুদ্ধই হয়নি, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধি কীভাবে তৈরি হলো? ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, সেই সময় বার্মায় (বর্তমান মিয়ানমার) যুদ্ধকারী সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য কুমিল্লায় একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যাদের মৃত্যু হয়েছিল তাদের সমাহিত করার জন্যই সমাধিস্থলটি তৈরি করা হয়। সেনানিবাস, হাসপাতাল এবং এই সুন্দর স্থানের কারণেই ময়নামতিকে সমাধিস্থল হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল।
ময়নামতিতে যুদ্ধসমাধি তৈরি এবং সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন। প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি ম্যানেজার মুফতাহুস সাত্তার হিল্লোল বলেছেন, প্রায় ৬ একর জমির ওপর এই সমাধি তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ময়নামতিতে বড় একটি হাসপাতাল ছিল। এখানে সমাহিত সৈনিকদের বেশিরভাগই ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছিলেন। পরে যুদ্ধের পর আরও কিছু লাশ বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে আনা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক। তার বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার চৌসই গ্রামে। তার কর্মজীবনের বড় অংশই কেটেছে কুমিল্লা সেনানিবাসে।
সাজ্জাদ আলীর বাবা প্রয়াত কাজী আবদুল মুত্তালিব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ময়নামতিতে যুদ্ধসমাধি তৈরির স্থান নির্বাচনী কমিটিতেও তিনি ছিলেন। সাজ্জাদ আলী বলেছেন, তার বাবা ময়নামতির যুদ্ধসমাধি বারবার ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছেন। সমাধিসৌধটি নির্মাণের পেছনের কাহিনিও তিনি বলেছেন।
সাজ্জাদ আলী বলেছেন, কুমিল্লায় তখন সেনানিবাস ছিল। বার্মায় ব্রিটিশদের সঙ্গে জাপানিদের যুদ্ধ চলছিল। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ফিল্ড মার্শাল উইলিয়াম জোসেফ স্লিম। জাপানিরা সিঙ্গাপুর দখল করার পর চীনের অনেক স্থান অধিকার করে ভারতের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। সেই সময় ভারতকে ‘দ্য জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’ হিসেবে দেখা হতো। জাপানিরা বার্মায় ঢুকে রাজধানী রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন) দখল করে। সেই সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে জাপানিদের যুদ্ধ শুরু হয়। বার্মায় অনেক সৈনিক নিহত হন।
সাজ্জাদ আলী জানান, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ কিছু জায়গায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা যুদ্ধসমাধি তৈরি করেছিলেন। কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে উইলিয়াম স্লিম তার সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সে সময় প্রতিপক্ষও ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় বোমাবর্ষণ করেছিল। এক পর্যায়ে উইলিয়াম স্লিম একটি আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ডো বাহিনী তৈরি করেন। এটি এখনও কুমিল্লা সেনানিবাসে আছে।
তখন ময়নামতিতে একটি হাসপাতাল তৈরি করা হয়। বার্মায় লড়াই করা ব্রিটিশ এবং মিত্রদেশগুলোর সৈনিকদের বেশিরভাগই ময়নামতি এবং চট্টগ্রামে চিকিৎসার জন্য আনা হতো। তবে কুমিল্লায় কোনো যুদ্ধই হয়নি।
সাজ্জাদ আলী বলেছেন, আহত জাপানি সৈনিকদের মধ্যে যাদের চিকিৎসার জন্য আনা হতো তাদের সবাই গ্রেফতার হয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সৈনিকেরা যখন মারা যান, তখন স্লিম একটি যুদ্ধসমাধি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।
সম্ভাব্য জায়গা নির্বাচনের জন্য একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটিতে সাজ্জাদ আলীর বাবাও ছিলেন। তখন তিনি স্লিমের সদর দপ্তরে ‘ডিফেন্স ইন্টারপ্রেটার’ হিসেবে কাজ করতেন।
সাজ্জাদ আলী আরও বলেছেন, প্রথমে ব্রিটিশদের সমাধি করার কাজ শুরু হয়। জাপানিদেরকে শত্রুপক্ষ হিসেবে দেখায় বলে তাদের জন্য সমাধিস্থলে একটি আলাদা কোণ বরাদ্দ করা হয়। যারা মুসলিম ছিলেন, তাদেরকে আলাদাভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে দাফন করা হয়। কারণ মুসলিমদের কবর দেওয়ার পদ্ধতি ভিন্ন। সেখানে সমাহিত করা বেশিরভাগই আহত অবস্থায় ময়নামতিতে চিকিৎসার জন্য এসে মারা গেছেন।
বর্তমান জায়গাটি যুদ্ধসমাধি হিসেবে বাছাই করার কারণ হিসেবে সাজ্জাদ আলী বলেন, এটি সেনানিবাসের পাশে এবং খুবই সুন্দর। ব্রিটিশরা প্রতিটি সমাধিস্থলের জন্য খুবই সুন্দর জায়গা বাছাই করতেন। ময়নামতির জায়