**আওয়ামী লীগের তৈরি আইনে শুরু হলো শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া**
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগ প্রণীত আইনেই শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে অতীতের মতোই এবারেও বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে।
গতকাল আইন মন্ত্রণালয়ের একটি মতবিনিময় সভার পরই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় ঘটে যাওয়া গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে ট্রাইব্যুনাল। এর আগেই সরকার ৮ দফা সংশোধনী প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেছিল।
এদিকে, আনুষ্ঠানিকভাবে আইন সংশোধন না করেই আওয়ামী লীগের আমলের আইনেই কাজ শুরু করায় প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা বলা হয়েছে। এই আইন সংশোধন না করেই অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার করায় বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
**শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা**
তবে সরকার দাবি করছে, ট্রাইব্যুনালের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু এবং আইন সংশোধনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই। আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়ে আইন সংশোধন না করলেই চলবে। তবে বিচারকাজ শুরু করার আগে যদি আইন সংশোধন না করা হয়, তাহলে কিছুটা সমস্যা হতে পারে।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে এ পর্যন্ত কয়েকবার সংশোধনী আনা হয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো এবং ২০১২ সালে দ্বিতীয়বার সংশোধনী আনে আওয়ামী লীগ সরকার। সবশেষ ২০১৩ সালে তৃতীয়বার সংশোধনী আনা হয়।
আইনজীবীরা মনে করছেন, আইনের সংস্কার না করেই আওয়ামী লীগ আমলের আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করায় এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছেন, যেকোনো সময় সংঘটিত গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের আইনে কোনও বাঁধা নেই। ফলে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্কের কোনও সুযোগ নেই।
**ট্রাইব্যুনাল নিয়ে প্রশ্ন**
সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময় সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনের বেশ কিছু প্রস্তাব উঠে এসেছে। এর মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় গুম এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও রয়েছে। পাশাপাশি কোনও দল এই আইনের অধীন অপরাধ করলে তাদের ১০ বছর পর্যন্ত নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
গত সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এবং আরও দুজন বিচারক নিয়োগ করে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছে। অন্য দুজন সদস্য হলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কেন আন্তর্জাতিক বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন, এই শিরোনামে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান প্রথম আলোর ইংরেজি ভার্সনে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। এতে তিনি পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার জেলা আদালতের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং মাত্র ছয় দিন আগে হাইকোর্টে নিয়োগ পেয়েছেন। আর মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ। এছাড়া শফিউল আলম মাহমুদ আইনজীবী থেকে মাত্র ছয় দিন আগে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তিনি বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবী ফোরামেও ছিলেন।
এসব বিষয় উল্লেখ করে ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন, এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে। তিনি তার লেখায় একতরফা বিচার না হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে ধারণা রাখা বিদেশি বিচারক নিয়োগের পরামর্শও দিয়েছেন।
তবে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, কারও রাজনৈতিক চিন্তা থাকলেও তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন না, এটা সঠিক নয়। এছাড়া বাংলাদেশের আইনে বিদেশি বিচারক নিয়োগের কোনও সুযোগ নেই।