অলিপুর গ্রাম। একেবারে শান্ত প্রভাত। পূবের আকাশে সূর্য কিরণ দেখা দিতে শুরু করেছে। আধাপাকা ধানের বাঁকা শিষে জমে আছে শরতের শিশির। সূর্য থেকে আলো তির্যকভাবে ছড়িয়ে পড়ে শিশিরে আর তা এসে আঘাত করে চোখে। গ্রামের পূর্বদিক থেকে সাপের মতো আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা আসে। জেলা সদরের আদি পথ থেকে বের হয়ে এই রাস্তা অলিপুরকে দুভাগে ভাগ করে দিয়েছে। গ্রাম থেকে জেলা পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার। এ কারণেই এ গ্রাম এখনও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মতই মনে হয়। এই রাস্তার পাশেই অলিপুর উচ্চ বিদ্যালয়। সকাল হতেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের হৈচৈ শুরু হয়। এটা বিকেল পর্যন্তই চলে। তার পরেই শান্তি নেমে আসে। তখন আর এত সাড়াশব্দ থাকে না। এমনকি গাছের পাতা বা ডালপালা পড়ার শব্দও একেবারে পরিষ্কার শোনা যায়।
তমিজউদ্দিন স্কুলের নাইট গার্ড। তার বয়স ৫২ কিংবা ৫৮। স্কুল থেকে তার বাসা অনেকটা দূরে নয়। বিকেল থেকে ফজরের নামাজ পর্যন্ত সে ডিউটি করে। তারপর প্রায় অর্ধেক দিন সে ঘুমায়। একদিন সকালে দেখা গেল, কাঁচা রাস্তা দিয়ে একটি সাদা গাড়ি আসছে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মাঠের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তারা অপেক্ষা করছে গাড়িটা তাদের স্কুলের কাছে এসে দাঁড়াবে। হঠাৎ গাড়িটি স্কুলের কাছে এসে দাঁড়ালো। রাস্তার পেছনে এসে গাড়ি দাঁড়িয়েছে। তারপর হুট করেই কয়েকজন লোক গাড়ি থেকে নেমে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে চলে গেল। এর মধ্যে একজন বলল, “আমরা গোয়েন্দা থেকে এসেছি।” একটু পরেই তারা জিজ্ঞেস করল, “তমিজউদ্দিন কোথায়? তার বাড়িটা কোন দিকে?”
হঠাৎ গোয়েন্দাদের আগমনে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল হোসেন কিছুটা ভড়কে গেলেন। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে তমিজউদ্দিনের বাড়ি কোন দিকে তা দেখিয়ে দিলেন। এরপরে কিছুক্ষণ পরেই গোয়েন্দাদের গাড়ি তমিজউদ্দিনের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো। গ্রামজুড়ে এ নিয়ে একটা হইচই পড়ে গেল। একটু পরেই স্কুলের পেছনে মানুষের ভিড় জমে গেল। সেই ভিড়ের মধ্যেই জসীম শেখ দাঁড়িয়ে বলল, “তমিজউদ্দিন সাহেব কি করেছে? পুলিশ তাকে কেন ধরবে? কিন্তু তিনি তো বড় পরহেজগার মানুষ। তিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। কখনও কারও কোনো ক্ষতি করেননি।” পাশ থেকে আক্কাস আলী বলল, “তাহলে পুলিশ এমন নিরপরাধ মানুষকে কেন ধরবে?” তমিজউদ্দিনকে গোয়েন্দারা ধরে নিয়ে যাওয়ার পরদিন রেখাকেও তারা ধরে নিয়ে যায়।
রেখা খাতুন তমিজউদ্দিনের ছোট মেয়ে। বিদ্যুত্ খাতুনকে পাশের গ্রামের বদরুলের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বদরুল একজন মদ্যপ। তাই রেখা তাকে আর পছন্দ করে না। সে একটি কারখানায় চাকরি নেয়। সেখানে তার সঙ্গে হয় বাশারের পরিচয়। দুজন একসঙ্গে অফিস আসা–যাওয়া করে। রাতে যখন বাসায় ফিরে সে পথে একা থাকে, ভয় করে তার। তখন বাশার তার সামনে সামনে হাঁটে। দুজন একসঙ্গে কাজ করে। তবুও রাতে বাশারের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে তার। এমনকি সকালে দেখা হবে জেনেও রাতে ঘুম আসে না রেখার। তাই রাতে বাশারকে ফোন দিয়ে কথা বলে। এতে তার মনটা একটু শান্ত হয়। কিন্তু রেখার এই ব্যস্ততা তার স্বামীর সন্দেহের কারণ হয়। সে এ নিয়ে তমিজউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলে। তমিজউদ্দিন বলেন, “রেখা খুব ভালো মেয়ে। সে কখনও এমন কাজ করতে পারে না।” কিন্তু বদরুল এ কথা বিশ্বাস করতে পারে না। রেখার প্রতি বদরুলের সন্দেহ একটু একটু করে বাড়তে থাকে। রাতে মদ খেয়ে সে বাসায় আসে। সে খাবার দাবি করে। রেখা বলল, “আপনি সারাক্ষণ মদ খান, আমি খাবার আনব কোথা থেকে? ঘরে তো রান্না হয়নি।” কথা শুনে বদরুল রেগে আগুন হয়ে উঠল। তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেখাকে কোমরের নিচে সজোরে লাথি মারে। রেখার প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। তাই সে বদরুলকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে।
তমিজউদ্দিনের বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে কামালপুর গ্রাম। এই গ্রামেই বাশারদের বাড়ি। বাশারের মা-বাবার দুই ছেলের মধ্যে সে ছোটটি। তার বয়স ২২। সে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে আর পড়াশোনা করেনি। তার বড় ভাই আবসার তার থেকে পাঁচ বছর বড়। সে একটি কারখানায় কাজ করে। জমিলা খাতুন তার দুই ছেলেকে আদরে মানুষ করেছেন। বাশারের চাচি জমিলা খাতুনকে বলেন, “আপা, এখন তো আপনার আনন্দের দিন চলেছে। এবার বাশারের বিয়েটা দিন।” এই কথা শুনে জমিলা খাতুন বললেন, “আগামী শীতকালে ছেলের বউ নিয়ে আসব।”
একদিন সকালে বাশার বাড়ি থেকে বের হয় আর ফেরে না। জমিলা খাতুন সারারাত কাটান ছটফট করে। ভোরের আলো ফুটতেই সে খোঁজে বের হন। পাগলের মতো সে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেন। কারখানায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাত আটটায় সে কারখানা থেকে