
বাংলাদেশে আদিবাসীদের স্বীকৃতি ও একীভূতকরণ
ভূমিকা:
বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতি এবং সংস্কৃতির লোকেরা বাস করে। তবে স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন মানুষের বিকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক অসমতা রয়েছে। বাঙালি ছাড়া অন্য জাতিসত্তারা তাদের জীবনযাত্রার সুবিধার অভাবে ভুগছেন।
আদিবাসী অন্তর্ভুক্তকরণের চ্যালেঞ্জ:
- সরকার এখনো আদিবাসী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, উপজাতি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের সঠিক পরিচয় নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়নি।
- আদিবাসীরা ভূমিচ্যুতি, বাস্তুহারা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং নানা রকমের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
- ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অবমাননাকর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসীদেরকে "ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী" হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে, যা তাদের অধিকারকে আরও ক্ষুণ্ন করেছে।
উত্তরবঙ্গের অবস্থা:
- গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে আদিবাসীদের ভূমিচ্যুতি এবং ২০১৬ সালে তিনজন সাঁওতালকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
- সাতক্ষীরা এবং বরগুনা-পটুয়াখালী অঞ্চলে রাখাইন এবং খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরাও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট:
- পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এটিকে অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
- ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে আদিবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়নি।
- এই চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠিত বিশেষ শাসন ব্যবস্থার অধীনে আদিবাসীদের কার্যকর রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা:
- বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য আদিবাসীদের সম্মানজনক স্বীকৃতি প্রদান এবং তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
- সংবিধানের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে "ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী" শব্দটির পরিবর্তে "আদিবাসী" শব্দটি সংযুক্ত করা উচিত।
- তাদের সমষ্টিগত মালিকানা অধিকারগুলিকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩ এর মালিকানা ধারায় স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
- রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের পরিবর্তে সংবিধানের ২(ক) অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
- সমতলের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার এবং সামগ্রিক কল্যাণের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় বা কমিশন স্থাপন করা দরকার।
সরকারের দায়িত্ব:
- আদিবাসীদের ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমর্থনে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রদর্শন করা।
- আদিবাসী প্রতিনিধিদের সংবিধান প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা।
- পার্বত্য চুক্তিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এর সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা।
উপসংহার:
আদিবাসীদের আধুনিক বাংলাদেশে স্বীকৃতি এবং একীভূতকরণ একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। এটি কেবল অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং বহুত্ববাদী বাংলাদেশের দিকে একটি পদক্ষেপই নয়, বরং সকল নাগরিকের জন্য একটি ন্যায়সঙ্গত এবং সমৃদ্ধ সমাজ তৈরির মৌলিক শর্তও।
এ জাতীয় আরো খবর...