৫২ জাতীয় ডেস্ক।।
রংপুরের আইনজীবী রথীশচন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনার স্ত্রী দীপা ভৌমিক এবং দীপার দুই সহকর্মীকে গ্রেপ্তারের পর তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর মঙ্গলবার মধ্যরাতে র্যাব রংপুর শহরে রথীশের বাড়ির আধা কিলোমিটার দূরে তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার নির্মাণাধীন একটি বাড়ি থেকে লাশটি উদ্ধার করে।
রথীশের ভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিক সুবল লাশটি তার ভাইয়ের বলে শনাক্ত করেন। রথীশের স্ত্রী দীপাকেও সেখানে নিয়ে গিয়েছিল র্যাব।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র্যাব-১৩ এর অধিনায়ক মেজর আরমিন রাব্বী ইঙ্গিত দিয়েছেন, দীপার সঙ্গে তার এক সহকর্মী শিক্ষকের সম্পর্কের জেরে রথীশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
যে বাড়িতে রথীশের লাশ পাওয়া গেছে, তা দীপার সহকর্মী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের ভাইয়ের বাড়ি।
দীপাকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে মেজর রাব্বী সাংবাদিকদের বলেন, “তার দেওয়া তথ্যেই লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।”
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে হত্যার পর লাশটি নির্মাণাধীন বাড়িটিতে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।
রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেকও লাশ উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক রথীশ জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন।
হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে নগরীর বাবুপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে শহরের দিকে রওনা হয়েছিলেন রথীশ। এরপর থেকে তার সন্ধান ছিল না।
অন্তর্ধানের পর ট্রাস্টের নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা ভূমিদস্যুরা রথীশকে ধরে নিয়ে গেছে।
কিন্তু সোমবার তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম ও মতিয়ার রহমানকে আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন রথীশ। তার স্ত্রী দীপা এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদা খাতুন জানান।
সোমবার সন্দেহভাজন নয়জনকে গ্রেপ্তারের পর কামরুল ও মতিয়ারকে আটক করা হলেও তখন কিছু জানায়নি পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাদের গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেন কোতোয়ালি থানার ওসি বাবুল মিঞা।
তখন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেছিলেন, “যাদের আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সে তথ্য ধরেই আমরা কাজ করছি। উদ্ধারে বিলম্ব হলেও ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”
এর মধ্যে দুপুর থেকে রথীশের বাড়ির পাশের ডোবাটিতে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। রথীশের চাচাত ভাই লিটন ভৌমিকের গোয়াল ঘরের পাশের আট-দশ ফুট গভীর এই ডোবায় গোবরসহ বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ছিল।
সেখানে বিকালে আবর্জনার নিচে হালকা রক্তের ছিটা লাগানো সাদা একটি শার্ট পাওয়ার পর তা মাহিগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়।
রথীশের ছোট ভাই সুশান্ত তা দেখে বলেন, “শার্টটিতে রক্তের ছিটার মতো লেগেছিল। তবে সেটি ভাইয়ের নয়।”
রাতে ডোবায় তল্লাশি অভিযান পুলিশ স্থগিত রাখার খানিক পর তাজহাটে র্যাবের অভিযানে কামরুলের ভাইয়ের নির্মাণাধীন বাড়িতে একটি লাশ পাওয়ার খবর আসে। সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় দীপাকেও। এরপর লাশ শনাক্ত করা হয়।
রথীশ নিখোঁজ হওয়ার পর সুশান্ত বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন। তবে তাতে কাউকে আসামি করা হয়নি।
র্যাব কর্মকর্তা রাব্বী সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নে বলেন, তারা তদন্ত শেষ করে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাবেন।
সংবাদ মাধ্যমের সামনে মায়াকান্না কেঁদে বলেছিলেন স্বামীর জীবনের জন্য আশঙ্কিত৷ তখনও বোঝা যায়নি কী ভীষণ ষড়যন্ত্রের তিনিই খলনায়িকা৷ শেষ হল নাটক৷ অবৈধ প্রেমের কথা চাপা দিতেই স্ত্রী দীপার ষড়যন্ত্রে খুন হতে হয়েছে আইনজীবী রথীশচন্দ্র ভৌমিককে৷ মিলেছে নিখোঁজ আইনজীবীর দেহ৷ মঙ্গলবার গভীর রাতে রংপুর শহরের তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার নির্মাণাধীন একটি বাড়ি থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার হতেই চাঞ্চল্য ছড়ায় রংপুরে৷
এই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর স্ত্রী দীপা ভৌমিককে৷ তদন্তে উঠে এসেছে, শিক্ষক সহকর্মীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে স্বামীকে খুনের ছক করেছিলেন দীপা৷ গ্রেফতার করা হয়েছে দীপা দেবীর গোপন প্রেমিককে৷ জেরায় তারা স্বীকার করেছেন খুনের কথা৷ তাদের দেওয়া তথ্য থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করেছে ব়্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (ব়্যাব)।
তদন্তকারী অফিসার মেজর রাব্বী সাংবাদিকদের বলেন, নিহতের স্ত্রীর দেওয়া তথ্যেই লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও, অন্তত চার-পাঁচ দিন আগে খুন করা হয় রথীশচন্দ্রকে৷ খুনের পর দেহটি মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল৷ পরে রথীশের ভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিক সুবল মৃতদেহ শনাক্ত করেন। ঘটনাস্থলে রথীশের স্ত্রী দীপাকেও নিয়ে গিয়েছিল র্যাব। যে বাড়িতে রথীশচন্দ্র ভৌমিকের দেহ পাওয়া গেছে, সেই বাড়ি দীপার সহকর্মী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের ভাইয়ের বাড়ি।
নিহত রথীশচন্দ্র ভৌমিক ওরফে বাবুসোনা ছিলেন রংপুরের পাবলিক প্রসিকিউটার৷ তিনি জামাত ইসলামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে মামলা লড়তেন৷ বিভিন্ন সময়ে আনসারুল্লা বাংলা টিম ও নব্য জেএমবি জঙ্গি সংগঠনের হাতে খুন হওয়া ব্যক্তিদের পক্ষে মামলার অন্যতম আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন৷
গত কয়েকদিন ধরেই রথীশচন্দ্র ভৌমিকের অন্তর্ধান ক্রমশ জটিল আকার নিয়ে ফেলে৷ প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, যেহেতু তিনি জামাত বিরোধী মামলা লড়তেন তাই তাকে কোনও জঙ্গি সংগঠন অপহরণ করেছে৷ এমনকি রথীশবাবুর স্ত্রী দীপা ভৌমিক জানিয়েছিলেন, স্বামীর চিন্তায় আতঙ্ক বাড়ছে৷ তবে তাঁর কথায় অসংলগ্নতা ধরা পড়ে৷ সেই সূত্র ধরেই পুলিশ ও ব়্যাব তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়৷ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারা গিয়েছিল, পারিবারিক জীবনে অশান্তিতে ছিলেন রথীশবাবু৷
কী সেই কারণ? এই প্রশ্নেই মিলেছে যাবতীয় রহস্যের চাবিকাঠি৷ জানা গিয়েছে, আইনজীবী রথীশচন্দ্রের স্ত্রী দীপা ভৌমিকের সঙ্গে তাঁরই এক শিক্ষক সহকর্মীর অবৈধ সম্পর্ক ছিল৷ সেটা মেনে নিতে না পারায় চক্রান্তের শিকার হন রথীশচন্দ্র৷ যেহেতু স্বামী জঙ্গি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে মামলা লড়েন তাই রথীশচন্দ্রকে অপহরণ করিয়ে জঙ্গি চক্রান্তের জাল বুনেছিলেন দীপাদেবী ও তাঁর প্রেমিক৷ সেই মতো পাঁচদিন আগে রথীশচন্দ্রকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়৷
এরপর পুরো সাজানো ঘটনা মতো তাকে খুন করে রটিয়ে দেওয়া হয় অপহরণের গল্প৷ তার সঙ্গে রটিয়ে দেওয়া হয় জঙ্গিদের বদলা নেওয়ার বিষয়টি৷ এদিকে রথীশবাবুর অন্তর্ধান নিয়ে সরব হয় বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, রংপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট৷ দুই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তিনি৷
তদন্তে নেমে পুলিশের ধারণা হয় এর পিছনে অন্য কারণ আছে৷ লাগাতার জেরায় রথীশবাবুর স্ত্রী এক সময় ভেঙে পড়েন৷ তার বয়ানের পর স্থানীয় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম ও মতিয়ার রহমানকে আটক করা হয়৷ এরপরেই তদন্তে মোড় নেয়৷