ঋতু, মনিকা, রুপনাদের পেয়েছে বাংলাদেশ
ঋতুপর্ণা চাকমা একটু আবেগে জড়িয়ে গেলেন বীরসেন চাকমা সম্পর্কে কথা বলার সময়। তার কণ্ঠস্বরও যেন কিছুটা কেঁপে উঠল, ‘আমি আজকে এখানে, দেশের হয়ে খেলছি, এর পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান বীরসেন স্যারের। তিনিই আমার মধ্যে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন।’
শুধু ঋতুপর্ণাই নন, সাফজয়ী নারী ফুটবল দলের দুই শীর্ষ তারকা ঋতুপর্ণা চাকমা এবং রুপনা চাকমাকেও আবিষ্কার করেছেন রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার মগাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা। মনিকা এসেছেন খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা থেকে।
২০১১ সালে বঙ্গমাতা ফুটবল উৎসব দেশব্যাপী ব্যাপক আকারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিস থেকে স্কুলে স্কুলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল খুদে ফুটবলারদের দল তৈরি করে বঙ্গমাতা কাপে অংশ নেওয়ার জন্য। ফুটবলপ্রেমী বীরসেন চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খুদে ফুটবলারদের বাছাই করে তৈরি করলেন মগাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দল। প্রথমদিকে খুদে ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দিতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। তবে সেই দলটিই জাতীয় পর্যায়ে শিরোপা জিতে নিল। বাংলাদেশ পেয়ে গেল ঋতু, মনিকা, রুপনাদের।
কিন্তু এই অনাবিষ্কৃত রত্নগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলার কাজটি করেছেন স্থানীয় পর্যায়ের কোচরা। রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বরুণ বিকাশ দেওয়ান দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলেছেন। আবাহনী, মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধার জার্সিতে গোটা নব্বই দশকে ঢাকার ফুটবলে বরুণ দেওয়ান মানে ছিল বড় নাম। ১৯৯৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে মিয়ানমারের চারজাতি টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছিলেন তিনি। কোচ হিসেবে ঋতু-রুপনা-মনিকাদেরকে তৈরি করার কাজটি করেছেন তিনি এবং তার বড় ভাই অরুণ বিকাশ দেওয়ান। অরুণ দেওয়ানকেও ফুটবলপ্রেমীদের অপরিচিত নয়। আবাহনী, মোহামেডান দলে না খেললেও এই গোলকিপার খেলেছেন মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবে। জাতীয় দলের হয়েও কয়েকটি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা আছে তার। নব্বই দশকে ঢাকার ফুটবলে মাঝারি শক্তির দলগুলোর বড় তারকা ছিলেন অরুণ। ছোট ভাই বরুণের সঙ্গে তিনিও খুদে ফুটবলারদের হাত ধরে ফুটবলের পাঠ দিয়েছেন। কিন্তু বীরসেন বলুন, কিংবা বরুণ বা অরুণ দেওয়ান বলুন, সে সময় কি কেউ ভেবেছিলেন, তাদের হাতে গড়া সেই খুদরাই একদিন সারাদেশকে মাতাবে! দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে! কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে টানা দুইবার সাফ জেতার দিন তাদেরই ছাত্রী ঋতুপর্ণা হলেন সেরা খেলোয়াড়, রুপনা হলেন সেরা গোলকিপার। আর মনিকা তো বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন।
রাঙামাটির মগাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমার বাড়ির পাশেই ছিল ঋতুপর্ণা চাকমাদের বাড়ি। ঋতুকে তিনিই ভর্তি করেছিলেন মগাইছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ঋতু ছোটবেলা থেকেই প্রতিভা দিয়ে চমকে দিয়েছিল, সেটি জানিয়েছেন তিনি, ‘আমি ২০১১ সালে আমার স্কুলের দল তৈরি করে জাতীয় পর্যায়ে শিরোপা জিতেছিলাম। ২০১২ সালে ঋতু আসে দলে। খুব লাজুক একটা মেয়ে ছিল সে। ফুটবলে লাথি দিতে চাইত না। কিন্তু যখন দিত, তখন দুই পায়েই সমানভাবে দিত। আমার মেয়েটির প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। সেই মেয়েটিই এখন জাতীয় দলে খেলে, দেশকে শিরোপা জেতায়—ভাবলে নিজেকে বেশ তৃপ্ত মনে হয়।’
রুপনা তার স্কুলেই পড়তেন। মনিকাকে তিনি খাগড়াছড়ি থেকে নিয়ে এসেছেন। শুধু ঋতু, মনিকা, রুপনারাই নন, তিনি খাগড়াছড়ি থেকে নিয়ে এসেছিলেন দুই বোন আনাই মোগিনি এবং আনুচিং মোগিনিদেরও। এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করার একটা জেদ ছিল তার। তবে তিনি তো ফুটবলের কলাকৌশলগত ব্যাপারগুলো জানেন না। তাই তিনি শরণাপন্ন হয়েছিলেন বরুণ এবং অরুণ দেওয়ানের কাছে, ‘বরুণ বিকাশ দেওয়ান আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলেছেন, তার ভাই অরুণও। ওনারা রাঙামাটিতে কোচ হিসেবে কাজ করেন। আমার মেয়েদের প্রশিক্ষণের জন্য আমি তাদের কাছে গিয়েছিলাম। ওনারা সাদরে রাজি হয়েছিলেন। এক পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি। ঘষেমেজে তৈরি করেছেন। ঋতু, মনিকা, রুপনা, আনাই, আনুচিংদের প্রতিভা সম্পূর্ণ বিকাশ হয়েছে তাদের হাত ধরেই।’
বরুণ বিকাশ দেওয়ানের ভালো করে মনে আছে ঋত