বেক্সিমকোতে দায়িত্ব পেলেন ‘রিসিভার’
শীর্ষ শিল্প গোষ্ঠী বেক্সিমকো গ্রুপে ‘রিসিভার’ নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই রিসিভারের কাজ হচ্ছে এই গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। আদালতের নির্দেশে এই দায়িত্বের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে নিযুক্ত করা হয়েছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বেক্সিমকো গ্রুপের সব সম্পদ একত্রীকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সঙ্গে ছ’মাসের জন্য একজন রিসিভার নিয়োগেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এখন কারাগারে আছেন। ছাত্রদলের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। বেক্সিমকো পোশাক রপ্তানি এবং ওষুধ উৎপাদনকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র হুসনে আরা শিখা জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে বেক্সিমকো গ্রুপ আপিল করেছে। আজ এই বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
রিসিভার নিয়োগ ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে আছে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্তে আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়োগ এবং ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’-এর ফরেনসিক নিরীক্ষা।
হুসনে আরা শিখা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পর্ষদ সভায় নেওয়া সব সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যাংক হিসাব থেকে সালমান এফ রহমানের নেওয়া অর্থ উদ্ধার এবং বিদেশে পাঠানো অর্থ ফেরত দিতে নির্দেশ দেয়। এই বিষয়ে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি মোহাম্মদ মাহবুব-উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাসুদ আর সোবহান আবেদনকারী হয়ে ২৫ বছর ধরে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডসহ বেক্সিমকোর অন্য সব ব্যবসার ঋণের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার জন্য হাইকোর্টে এক রিট আবেদন করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, সালমান রহমান তার ক্ষমতার জোরে প্রায় ২০টি ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এই কার্যে সাহায্য করেছে।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ অব কোম্পানিজের অন্য সব ব্যবসা–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত ঋণের পরিমাণ, ঋণের বর্তমান অবস্থা ও পরিশোধের তথ্য দেওয়ার জন্য রুল জারি করা হয়েছে। চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের উত্তর দিতে বলা হয়েছে।
সালমান রহমান ২০১৯ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা পদে নিয়োগ পান। এরপর তিনি আর্থিক খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন। আর্থিক খাতের বিষয়ে তার মতামতই গুরুত্ব পেত। এই ক্ষমতার জোরে নামে-বেনামে প্রায় ২০টি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ তুলে নেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন একাধিক নিয়ম শিথিল করে সালমান রহমানকে এভাবে অর্থ নিতে সহায়তা করে।
প্রথম আলোর সংগ্রহ করা নথিপত্র অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি আট ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণের পরিমাণ (নন-ফান্ডেডসহ) দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। এসব ব্যাংক বেক্সিমকোর একাধিক বন্ডে আরও ২ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তবে আরও অন্য ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেক্সিমকোর দেনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
নথিপত্রে দেখা যায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ ছিল প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। করোনা টিকা সরবরাহের কাজ পাওয়ার পর মাত্র এই ব্যাংকের ঋণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫ সাল থেকে তিনি ছিলেন আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এই ব্যাংকে গ্রুপটির দেনা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বেক্সিমকো গ্রুপ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে শীর্ষস্থানীয় গ্রুপগুলোর একটি। রিসিভারের দায়িত্ব হবে এই কার্যক্রমে যাতে কোনোভাবে ব্যাঘাত না ঘটে তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে যেসব টাকা নেওয়া হয়েছে, তা কীভাবে শোধ করা যায়, সে দিকেও নজর রাখবে রিসিভার।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার সবসম