জন লেনন: ৪০ বছরের জীবন, কিন্তু গল্পের শেষ নেই
নিউইয়র্ক শহরে সে রাতে তীব্র শীত পড়ছিল। তুষারবৃষ্টি হচ্ছিল। রাত তখন ১১টার কাছাকাছি। স্টুডিও থেকে বেরিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলেন জন লেনন, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ইয়োকো ওনো।
তাদের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ‘ডাকোটা’র সামনে ড্রাইভওয়ে বা গাড়িবারান্দায় জায়গাটা একটু অন্ধকারমতো। ড্রাইভওয়ের আগে একটা পাথরের আর্চওয়ে। লেননের লিমুজিনটা আর্চওয়ের কাছে এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে লেনন ও ইয়োকো ওনো ভবনের ফটকের সামনে দাঁড়ালেন।
ঠিক তখনই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলেন ২৫ বছর বয়সী মার্ক চ্যাপম্যান। এই তো সেই লেনন, যাকে তিনি খুঁজছেন! আস্তে করে ডাকলেন। পকেট থেকে বের করে ফেললেন স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন কোম্পানির পয়েন্ট থার্টি এইট রিভলবারটি। কাছাকাছি দূরত্বে থেকে চারটি গুলি করলেন।
শীতল রাতের নীরবতা ভেঙে গেল। শাঁ শাঁ করে ছুটে এল পুলিশের গাড়ি। জরুরীভাবে লেননকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। পুলিশ চ্যাপম্যানকে গ্রেপ্তার করল। তখনও তার হাতে ছিল লেননের ডাবল ফ্যান্টাসি অ্যালবামের কপি।
১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর শারীরিকভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার। কিন্তু বিটলস খ্যাত তারকা জন লেননের মৃত্যু নেই।
মৃত্যুর এই ৪৪ বছর পরও এখনও ভক্তদের হৃদয়ে বাজছে তার গিটার। যেন গেয়ে চলেছেন তিনি:
"Imagine there’s no countries
It isn’t hard to do
Nothing to kill or die for
And no religion too
Imagine all the people
Living life in peace…"
এই অক্টোবর মাসেই জন্মেছিলেন লেনন। সালটা ১৯৪০। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে এক বছর আগে। যুক্তরাজ্যের আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছে হিটলারের যুদ্ধবিমান। দাঁড়িয়ে আছেন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। প্রতিদিন বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে আসছে শত শত মৃত্যুর খবর।
ওই বছরের ৯ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের বন্দর শহর লিভারপুলের নিউক্যাসল রোডের একটি ছোট ফ্ল্যাটে জন্ম হয়েছিল লেননের। বাবা আলফ্রেড লেনন (ফ্রেডি লেনন নামে পরিচিত) সে সময় লিভারপুলে ছিলেন না। নাবিক বাবাকে আগেই জাহাজে করে পাড়ি দিতে হয়েছিল অন্য দেশে।
মা জুলিয়া ছেলের নাম রাখলেন জন উইনস্টন লেনন। তিনি চার্চিলের ভক্ত ছিলেন, এই নামেই তা পরিষ্কার। কিন্তু স্বভাবে আমোদপ্রিয় ছিলেন জুলিয়া। একা এই সন্তানকে বড় করতে চাইলেন না। ওদিকে বাবা ফ্রেডির জাহাজ তখন শত্রুদেশের কবলে। তাকে কারাগারে যেতে হয়েছিল। জুলিয়ার সঙ্গে ফ্রেডির বিচ্ছেদ ঘটে। শিশু লেননের বয়স তখন চার বছর। মা আরেকটা বিয়ে করলেন।
মায়ের বিয়ের পর লেননের আশ্রয় হলো খালা মিমির কাছে। মিমি-জর্জ দম্পতির সন্তান ছিল না। তাই আদর-আপ্যায়নের কমতি হলো না লেননের। তবে খালা মিমি স্নেহবৎসল হলেও কঠোর নিয়মে বিশ্বাসী ছিলেন।
প্রথমে ডোভডেল প্রাইমারি স্কুল, এরপর কেয়ারি হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন লেনন।
কিন্তু সংগীতসত্তা লেননের মধ্যে এল কোথা থেকে? এর উত্তর, তাঁর মা ও বাবা দুজনই ছিলেন শিল্পী। দুজনই ভালো ব্যাঞ্জো, উকুলেলে বাজাতে পারতেন। মা-ই শিখিয়েছিলেন শিশু লেননকে। মা নতুন সংসার পাতলেও নিয়মিত ছেলেকে দেখতে যেতেন। ছেলের শখ-আবদার পূরণের চেষ্টা করতেন। একবার স্কুলে থাকতেই লেনন মায়ের কাছে একটি গিটার কিনে দেওয়ার আবদার করলেন। তরুণ বয়সে গিটার পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন লেনন। সারাক্ষণ পড়ে থাকতেন গিটার নিয়ে।
ভালো মাউথ অর্গান বাজাতে পারতেন লেনন। স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটিতে লিভারপুল থেকে এডিনবরা যেতেন। বাসে জানালার পাশে বসে মাউথ অর্গান বাজাতে বাজাতে লম্বা পথটা শেষ হতো তাঁর।
কোনো গানের স্কুলে পড়েননি লেনন। আলাদা করে তাঁর কোনো গানের শিক্ষকও ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ছবি আকার প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ ঝোঁক। তাই ১৯৫৭ সালে ১৭ বছর বয়সে ভর্তি হলেন লিভারপুল আর্ট কলেজে।
পৃথিবী তখন এলভিস প্রিসলির মাতামাতি করছে। (এই শিল্পীও অকাল মারা গেছেন। মাত্র ৪২ বছর বেঁচে ছিলেন।) লেননও তাঁর বেজায় ভক্ত। এরই মধ্যে লিভারপুলের ম্যাথিউ স্ট্রিটের দ্য কাভার্ন ক্লাবে, যেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, গান করতে শুরু করলেন লেনন ও তাঁর দুই বন্ধু পল ম্যাকার্টনি ও জর্জ হ্যারিসন। তাঁরা দুজনই লিভারপুলের বাসিন্দা। তবে তাঁরা পড়তেন ভিন্ন কলেজে।
নিজের জগতে ভালোই ছিলেন জন লেনন। হঠাৎ মায়ের মৃত্যু এলোমেলো করে দিল তাঁর জীবন। রাস্তা পার হওয়ার সময় পু